ফিচার লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ফিচার লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৭

অপরাজিতা - কৃষ্ণকলি খাটুয়া

খোলা আকাশের নীচে প্রাণ খুলে কাঁদার অধিকার আমার নেই , নেই মনের কথা খুলে বলার অধিকার ;
ভাটিয়ালী সুরের ছন্দে জীবনের সুখ ভোগের অধিকার ? না , বিধাতা পুরুষ সেই অধিকারও দেননি আমায় ..!
যদিও তাঁরই অসীম কৃপায় মেনে নেওয়া আর মানিয়ে নেওয়ার পরীক্ষাতে প্রথম স্থানটা বরাবর আমারই !
তবুও ..কোন এক নিঃসঙ্গ মধ্যরাতে অব্যক্ত যন্ত্রণা আর বুকের মধ্যে গুমরে মরা দলা পাকানো অভিমান বাষ্প বেরিয়ে আসে নীরব অশ্রুবিন্দু হয়ে ..
দু চোখ বেয়ে নাকের ডগা দিয়ে গড়িয়ে পড়ে তা ভিজিয়ে দেয় -সমস্ত যন্ত্রণার সাক্ষী বালিশটাকে !
বুকের মধ্যে সংগোপনে রাখা ক্ষতটা ক্রমে গভীর থেকে হয় গভীরতর ...
ডানাকাটা কবুতরের মত ছটফট করতে থাকা ক্ষত বিক্ষত হৃদয় খোঁজে মুক্তির পথ ...আর অসহায় ভাবে তাকিয়ে দেখতে হয় চড়া নিলামে বিকিয়ে গেছে বহু আকাঙ্ক্ষিত সেই মুক্তির সিঁড়ি !!
জানি ,বন্ধু জানি ..
চির উদ্দামের অভিনয়ে হারা চলে না কোনও মতে ,
তাতে যে সৃষ্টির দুর্নাম , স্রষ্টার অপবাদ !
যন্ত্রণাকে অলংকার করে মেতে উঠি তাই নিজের মুক্তির পথ নিজে গড়ে নিতে ,
যে পথে মুক্তি পাবে হাজারো 'আমি ' ..
সৃষ্টি -ধ্বংসের উন্মাদনায় প্রাণ ভরে হেসে বলে উঠি - "জিতেছি , আমি জিতেছি ...আমি জয়ী !"

প্রাপ্তি - এস ঘোষ সুমনা

মনের অনেক গভীরে অনাদি নৈঃশব্দ্যের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেও কতবার নিঃশব্দ হয়েছি কে জানে!

খানখান নিজেকে ভেঙে জুড়তে চেয়েছি অভ্যাসবশত। অন্যস্বত্ত্বা অনর্গল হয়েছে টিকে থাকার লড়াইয়ের প্রয়োজন মেটাতে।

তোমাকে খুঁজেছি আশেপাশে। নেই তুমি...

যে রঙ মুঠোভরে আকাশ রাঙিয়েছে সেই মুঠোতেই শূন্যতাও মুষ্টিবদ্ধ। 

বিস্ময় নেই কোনো। ভাবাবেগ, ভালোবাসা, ঘেন্না, প্রাপ্তি নীল সীমানায় একের পর এক রঙ ছড়িয়েছে...

সন্তর্পনে বেছে নিতে হবে শুধুই প্রাপ্তিটুকু। 

ভালোবাসা তুমি বেঁচে থাকো সকল হৃদয় জুড়ে। বাকিটুকু বয়ে যাক...

কলকল ধ্বনিতেও নদীরও নৈঃশব্দ্য আছে। চেন কি? সময়ের হাতে হাত রেখে কোন দৃঢ় অঙ্গীকারে সে ছোটে বটে! তবু ওকেও ক্লান্তি, বিষণ্ণতা ছুঁয়ে গেছে।

পারো যদি দুহাত বাড়িয়ে জড়িয়ো তাকে.

বৃহস্পতিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

সে যে চলে গেল বলে গেল না - সিলভিয়া ঘোষ

ঈশান কোণের মেঘগুলো যখন মনখারাপের বিকেল সাজিয়ে আনে তখন ব্যালকোনিতে দাঁড়িয়ে অকারণেই ভিজতে থাকি, হেড ফোনে শুনতে থাকি 'বাত নিকলি হ্যায় তো'/জগজিৎ সিং...... 
চোখের জল মিশে যায় বৃষ্টির জলে। সামনের মাঠটায় বৃষ্টির জলে ফুটবল খেলতে থাকে সম বয়েসী শৈশব।
কতটা জীবন্ত সজীব ওরা। দুঃখ কষ্টগুলো ওদের ছুঁতে পারে না। ওদের মতোন তোলপাড়় করা বিকেলগুলো ফিরে পেতে চাওয়া আজ ভীষণ ভাবে দরকার , শোক-তাপগুলোকে যদি ভুলে যেতে পারতাম..... 
শোকগুলোকে সাজিয়ে রেখেছি মনের শো কেসে।তাকে হাত দিতে দেই না, ছুঁতে দেই না কাউকেই। ও যে একান্তই আমার ।মাঝে মাঝে ও কে ঝেড়ে মুছে তুলে রাখি। ব্যস্ত জীবনে দুঃখ প্রকাশ শখের বিলাসীতা মাত্র। তবুও সেই মাস, সেই দিন আজ উনিশ বছর ধরে নিজের অজান্তেই বালিশের ওয়াড় ভিজিয়ে চলেছে। সময় তোর জায়গায় নতুন কে স্থান করে দিলেও প্রথম অনুভূতিরা, না থাকার যন্ত্রণারা আজও দাগ কেটে বসে আছে শরীরে, মনে। জানি হয়তো কোন জন্মের ঋণ শোধ করতেই এসেছিলি তুই, শিখিয়ে গেছিস জীবনের অনেক বড় শিক্ষা। বিনা কষ্টে, প্রার্থনায় যে উপহার ঈশ্বর দিয়ে থাকেন তাকে অতি যত্নে, আদরে লালন করতে হয়, না হলে --সে চাঁদের দেশে চলে যায়, নতুন আলো নিয়ে চোখে প্রতি জোছনায় আমাকে আলো দিয়ে ভরিয়ে দেয়...... 

আমি সব ভুলে যাই, কাজল আঁকি চোখে, লুকিয়ে রাখি গোপন শোক, নতুন কাপড় পরি, ষষ্ঠীব্রতো পালন করি, সন্ধি পুজোর প্রদীপ জ্বালিয়ে এজন্মে না হোক আর জন্মে ফিরে পেতে চাই বলে মনে মনে বলি মা রে আবার আসিস আমার কাছে....... 

ঈশ্বর বনাম আমি - দূর্বা মিত্র

ঈশ্বর ভদ্রলোকটিকে আমি কখনো দেখিনি | দূর্বা নামক অপদার্থটিকে পৃথিবীর থালায় পরিবেশন করার বিশেষ অভিপ্রায় সেই ভদ্রলোকটির হয়তো ছিল না | 
আমার জন্ম যাতে না হয় - তাই আমার বাবাকে বহুদূরে জঙ্গলে ট্রান্সফার করা হয় - বাবার বাড়ির লোকেরা মায়ের ওপর অকথ্য অত্যাচার চালায় - সে খবর বাবার কাছে পৌঁছয় না |
একমাত্র ঠাকুরদা ছিলেন অন্য গ্রহের প্রাণী - বুক দিয়ে আগলে রাখতেন মেজো বৌমাকে | স্বামীর সাথে বৌমাটির পার্থিব দূরত্ব কখনোই মনোজগতে ঢুকতে দেন নি |
কাজেই একদিন আমি পৃথিবীতে এসেই গেলাম - মায়ের কোল শূন্য রইলো না |
আমাদের ফ্যামিলি ট্রি খানির এক বিচিত্র বৈশিষ্ট্য আছে | ঠাকুমা ফর্সা তো ঠাকুরদা কালো - মাতামহ ফর্সা তো মাতামহী কালো | মা ফর্সা - বাবা কালো | আর আছে ঠাকুরদার বাবার থেকে পাওয়া বিশেষ শিবনেত্র | 
আমাকে কোলে নিয়েই দেখা গেলো ঠাকুরদা - বাবা - আমি -- গায়ের রং সমান কালো - চোখ একরকম শিবনেত্র | ঠাকুরদা তৎক্ষণাৎ নাম রাখলেন শিবানী | বাবা একটু অবাধ্য হলেন | নিজে এয়ার ফোর্স এ থাকায় কাছে থেকে দেখেছেন প্রথম মহিলা পাইলট ক্যাপ্টেন দূর্বা ব্যানার্জি কে | ঠাকুরদার অনুমতি নিয়ে সরকারি নাম রাখলেন দূর্বা |
ওই বৈশিষ্ট্য আমার জীবনকালেই সমাপ্তি ঘোষণা করলো না | 
যে ভদ্রলোক প্রায় জবরদস্তি আমাকে বিয়ে করলেন - ওনার বাড়ি আর আমার বাড়ি রাজি ছিল না - তিনি ইতালিয়ান চেহারার অধিকারী | ফর্সা - ব্রাউন হেয়ার এন্ড আইস |
আমার বংশধারা - এমন কি ব্লাড গ্রুপ অব্দি সঞ্চালিত হলো আমার একমাত্র সন্তানে |
আমার মতো কালো - শিবনেত্র - ব্লাড গ্রুপ B + | ঠাকুরদার ব্লাড গ্রুপ জানা নেই |
বাবার - আমার - ছেলের - এক ব্লাড গ্রুপ এর অনুরণন | ভট্টাচার্য থেকে মিত্র হওয়াতে কোনো বাধাই ঈশ্বর ভদ্রলোক তৈরী করেন নি | দেখা যাক এরপর কি হয় !

রবিবার, ২ জুলাই, ২০১৭

ভানু - কাদম্বরী ___ অরূপজ্যোতি ভট্টাচার্য

বৈষ্ণব সাহিত্যে রাধা কৃষ্ণের প্রেম এক শাস্ত্রীয় মর্যাদা পেয়েছে। যে প্রেম কে বাস্তবের সাথে মেলানো যায় না। অথচ বাস্তব প্রেমের সব উপাদান সেই প্রেমে আছে। পূর্বরাগ, অনুরাগ এগুলো প্রেমের এক একটা শাস্ত্রীয় পর্যায়। সব কিছুর মধ্যে দিয়ে রাধা কৃষ্ণের প্রেম এমন একটা শাস্ত্রীয় পর্যায় পৌঁছে গেছে যেখানে বাস্তবের সাথে অমিলটাই বেশি। কেউ বলেন রাধার সুখ অধিক কেউ বলেন রাধার অত্মসমর্পন। রাধা সব সুখ বিসর্জন দিয়েছেন। শাস্ত্রে যাকে বলা হয় রাগাত্মিকা অথবা রাগানুগা। সাহিত্যের দর্পনে সমাজের যে চিত্র ফুটে ওঠে সেখানে নায়ক নায়িকার মিলনের সাথে রাধা কৃষ্ণের মিলনের একটা মৌলিক পার্থক্য থেকে গেছে। বাস্তবের প্রেম লৌকিক। রাধাকৃষ্ণের প্রেম অ-লৌকিক। তাই কৃষ্ণকে বলাহয় রসরাজ অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ রস। বাংলা সাহিত্যে এরকম আর একটি সম্পর্ক আছে. রবীন্দ্রনাথ আর কাদম্বরী দেবীর সম্পর্ক। রবীন্দ্রনাথ বা ওনার বৌঠানের মধ্যে কেমন সম্পর্ক ছিল, সেটা চর্চা করা অবান্তর। তবে সেই সম্পর্কের যে সাহিত্যিক প্রতিফলন আমরা পেয়েছি সেটা বাংলা সাহিত্যে বিরল। যা রাধা কৃষ্ণের প্রেমের সাথে সমতুল্য।
ব্যারিস্টারি পড়তে অথবা এই এ এস হতে রবীন্দ্রনাথ ইংল্যান্ডে যান। বিদেশে পুরুষ নারীর প্রগতিশীল কালচার দেখে রবীন্দ্রনাথের মনে অনেক পরিবর্তন আসে। যে পরিবর্তন ধরা পড়ে কবির লেখা তৎকালীন তেরোটি পত্রতে যেগুলো ছিন্নপত্র তে স্থান পেয়েছে। সেই সময় বিদেশী মহিলাদের সম্পর্কে কাদম্বরী দেবীর কটাক্ষের উত্তর দিতে কবি লেখেন -তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতার। পরে গানটি ব্রাম্হসংগীত হিসেবে গাওয়া হতো। অর্থাৎ প্রেম পর্যায় থেকে জন্ম নিলেও এই গানের আবেদন পূজা পর্যায় তে। রবীন্দ্রনাথের বিবাহের পাঁচ মাস পর কাদম্বরী দেবী জ্যোতিন্দ্রনাথের ওপর অভিমান করে সম্ভবত আফিম খেয়ে আত্মহত্যা করেন। বৌঠানের মৃত্যুর পর কবি প্রকাশ করেন ভানু সিংহের পদাবলী। রাধা কৃষ্ণের প্রেমের আঙ্গিকে আসলে কবি এখানে ভানু -কাদম্বরী সম্পর্ককেই তুলে ধরেছেন। যেখানে রাধার রূপকে কাদম্বরী দেবী বলছেন মরণ তাঁর কাছে শ্যামের সমান। ভানুসিংহ বলছেন রাধা এটা তোমার মতিভ্রম। মরনকে তুমি শ্যামের সমান করছো। শ্যাম মৃত্যুর থেকে বড়ো। তুমি বিচার করে দেখো। ভানুসিংহের পদাবলী প্রমান করে রাধা কৃষ্ণের প্রেমের মতোই ভানু -কাদম্বরী প্রেম পবিত্র।
ভানুসিংহের পদাবলী প্রকাশের প্রায় ছয় বছর পর এক বর্ষা মুখর রাতে কবির স্মৃতিতে ধরা দেয় চন্দননগরে মোরান সাহেবের বাগানবাড়িতে বৌঠানের সাথে দোলনায় দোল খাওয়ার কথা। কবি লিখলেন ওগো নির্জনে বকুল শাখায় দোলায় কে আজি দুলছে দোদুল দুলছে। কবিতার নাম রাখলেন নববর্ষা। বর্ষার বর্ণনা কিন্তু ভেতরে জানিয়ে দিলেন প্রেমের সমর্পন। এর পরে প্রায় সাঁইত্রিশ বছর পর ভিক্তোরিয়া ওকাম্পোর সাথে দেখা হওয়ার পরে কবির মনে আবার ফিরে আসে সেই পুরোনো স্মৃতি। কবি লিখলেন -সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে ফুল ডোরে বাঁধা ঝুলনায়। সেই স্মৃতি টুকু ক্ষণে ক্ষনে কবির মনে আস্তে থাকে। সৃষ্টি হয় শাপমোচন নাটক।
ভানু -কাদম্বরী সম্পর্ক তাই বাস্তবের রতি দিয়ে মাপতে যাওয়া ভুল। এই প্রেমের আবেদন সাহিত্যে। তাই এই প্রেমের মৃত্যু নেই। এই প্রেম ও রাধা কৃষ্ণের প্রেমের মতো অ-লৌকিক।

শনিবার, ২২ এপ্রিল, ২০১৭

প্রতীক্ষায় ---- দেবদত্তা ব্যানার্জী

কিশোরী বয়সে 'শাপমোচন' আমায় বুঝিয়েছিল ভালবাসা কারে কয়। সৌন্দর্যের সংজ্ঞাটাই পাল্টে গেছিল আমার কাছে। ছোটবেলায় পড়া রূপকথা 'ব্যাঙ রাজকুমারের' গল্প ভেসে উঠেছিল মানস পটে। নিজেকে কমলিকা র মত স্বর্গ ভ্রষ্টা নারী মনে করতাম।কমলিকার মত আমিও দিবস রজনী কারো আসায় অপেক্ষা বুকে নিয়ে দিন গুনতাম। অসুন্দরের ভিতর সুন্দরকে খুঁজে ফিরেছি প্রতিনিয়ত। যা সত্যি সুন্দর তার প্রতি আকর্ষণ বোধ করি নি কখনো। অরুনেশ্বরের সন্ধানে পাগলের মত ছুটে বেড়িয়েছি, কমলিকা ছিল আমার মন প্রাণ জুড়ে। কিন্তু বসন্ত এত সহজে ধরা দেয় নি। আমার বিনিদ্র রজনী কেটেছে তার অপেক্ষায়। নিজের ভালবাসা দিয়ে কাউকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে পারি নি। আমার শাপ মোচন হয় নি .......

যৌবনের প্রারম্ভে এসে প্রেমে পড়েছিলাম অর্জুনের। আমি যেন সত্যিই চিত্রাঙ্গদা। মা এর ছিল ছেলের শখ। একমাত্র মেয়েকে ছেলেদের পোশাকেই সাজাতো বেশি। চুল ও ছোট করে কাটা। র‍্যাগিংএ একটা লাল শাড়ি ও টিপ পরে ও যখন  হাঁটতে বলেছিল রাগ হয়েছিল। কিন্তু যেদিন কলেজের নবীন বরনের অনুষ্ঠানে প্রথম চিত্রাঙ্গদা দেখেছিলাম বাড়ি ফিরে আয়নার সামনে নিজেকে উন্মুক্ত করে নিজের প্রতিচ্ছবিকে প্রশ্ন করেছিলাম "কেন?"
আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছিলাম অর্জুনের প্রেমে। নারী হয়ে উঠেছিলাম ওর জন্য। ছোট্ট টিপ, হাল্কা লিপস্টিক, মা এর ধূপছায়া রঙ এর ঢাকাই এ নিজেকে সাজিয়েছিলাম। অবাধ্য বয় কাট চুলে টারসেল দিয়ে বেঁধেছিলাম জুঁইয়ের মালা। আমার অর্জুনের জন্য আমি তখন সব পারি। আমার চোখে সে কোন আলো লেগেছিল জানি না, রাতারাতি আমূলে বদলে গেছিলাম। অর্জুন কে পাওয়ার জন্য চিত্রাঙ্গদা তখন পাগল। আর আমার পাগলামি দেখে নতুন সহপাঠীরা হতভাগ। কিন্তু হায় রে মন......

যার জন্য আমার মধ্যে এত পরিবর্তন সে চোখ তুলে দেখে নি। অবজ্ঞায় দুরে ঠেলে দিয়েছিল আমার ভালবাসা। আমার এই ভাবনা গুলোর কোনো দাম দেয় নি আমার কৃষ্ণসখা।

এ অপমান লেগেছিল আমার হৃদয়ে। সহ্য করতে সময় লেগেছিল। আস্তে আস্তে বদলে ফেলেছিলাম নিজেকে আবার। শিখেছিলাম ফ্লাট করতে, চটুলতা আর বাকচাতুর্যে জয় করতে শিখেছিলাম পুরুষ হৃদয়। পর মুহূর্তে ই পদদলিত করে নিতাম আমার প্রতিশোধ। হ্যাঁ, শ্যামার মতই হৃদয় হীনা নারীতে বদলে গেছিলাম। শ্যামার মতই পুরুষদের নিয়ে খেলা আমার লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল। কত পুরুষকে যে আমার মোহজালে বেঁধে তাদের হৃদয় নিয়ে খেলেছি মনে নেই। 
আমার জীবনেও প্রেম এসেছিল। বাংলা অনার্সের শান্ত ছেলেটা শুধু চুপ করে আমায় দেখত। মুখ ফুটে না বললেও ওর চোখের ভাষা আমি পড়তে পারতাম। তরুণ কিশোরের স্বপ্নিল দু চোখে আমি সেই ভালবাসা দেখেছিলাম। কিন্তু আমি যে তখন শ্যামা, বজ্র-সেনের জন্য ঐ সদ্য যুবকের ভালবাসাকে অপমান করে ছুটে গেছি আরও ওপরে। আমার কল্পনার বজ্র-সেনের খোঁজে আমি শ্যামা হয়ে রাতের পর রাত কাটিয়েছি প্রতীক্ষায়......

না, আমি কমলিকা হয়ে পৃথিবীর সব কুৎসিত কে, সব অসুন্দর কে সুন্দর করতে পারি নি। পারি নি চিত্রাঙ্গদা হয়ে অর্জুনের ভালবাসা পেয়ে নিজেকে ধন্য করতে, আজ আমি শ্যামার মত ছলনাময়ী, প্রতীক্ষায় আছি কোন এক বজ্র-সেনের......

রবীন্দ্রনাথের তিন নায়িকা ---- লীনা রায়চৌধুরী

উপলব্ধ সত্য এই-মনুষ্য পৃথিবীতে  সৃষ্টিতে স্রষ্টার পরেই যাঁর স্থান(যদি স্রষ্টায় বিশ্বাসী হই),চরিত্র সৃষ্টির সেই রূপকার-'বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর'।অন্তর্বিষয়ী ভাবের কবিত্ব থেকে বহির্বিষয়ী কল্পনালোকে তাঁর সদা সৃষ্টি ও কৌতুহলমুখী মন ছড়িয়ে পরে।
              তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলির একটা বড় অংশ জুড়ে আছে নারী।একদিকে যেমন নারীদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে তাঁর লেখনী শক্তি ধার দিয়েছেন-অন্যদিকে তৎকালীন সামাজিক অসঙ্গতি গুলো মূর্ত করে তুলেছেন বাস্তবতার আভাসে!
            রবীন্দ্র সৃষ্ট 'নষ্টনীড়' গল্পে চারুলতা ধনী গৃহবধূ।কোনও অভাব ছিল না,শুধু অভাব সাহচর্যের! স্বামীর মানসিক সমর্থন! কাগজের আবরণ ভেদ করে স্বামীকে পাওয়া তার পক্ষে ছিল দুরূহ।চারুর স্বামী রাষ্ট্রীয় কর্তব্য পালনে তৎপর ,স্ত্রীর প্রতি অবদমনের নীতি গ্রহণ করছেন তা উপলব্ধিতেই আসেনি।ফলস্বরূপ শারীরিক - মানসিকভাবে নিঃসঙ্গ ও বঞ্চিত চারু আঁকড়ে ধরে অমলকে।সেও সুযোগের সদ্ব্যবহার করে নিজের আত্মপ্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করে,চারুলতার অবদমন আর মানসিক নির্যাতনকে বাস্তবায়িত করে।অগ্রাহ্য বা অবহেলার ফুটে ওঠা ছবি সত্যিই নির্মম।অবাক পুরুষতন্ত্র!!
             'মানভঞ্জন'-এর গিরিবালার সৌন্দর্য বর্ণনা করে বলা হয়েছে'... অকস্মাৎ আলোকরশ্মির ন্যায়,বিস্ময়ের ন্যায়... একেবারে চকিতে আসিয়া আঘাত করেএবং এক আঘাতে অভিভূত করিয়া দিতে পারে'।এই গিরিবালার প্রতি ও স্বামী গোপীনাথ আকর্ষণহীন।নেই তার ভিতর সামান্যতম ভালোবাসা।কিন্তু ছিন্ন বন্ধন গিরি মুখবুজে মার খায় নি,অভিনব পন্থায় স্বামীর অবহেলার প্রতিদান দিয়ে গিরিবালা এক অনন্য প্রতিবাদী নারী হয়ে উঠেছে রবীন্দ্র-কথা সাহিত্যে।
          নারী-পুরুষের সম্পর্ক যখন একটা অভ্যাসের হয়ে ওঠে-সেই সামাজিক প্রেক্ষিতে 'স্ত্রীর পত্র'র মৃণাল পুরনো মূল্য বোধের দায় মানতে অস্বীকার করে।পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে ওঠে।সংসারের প্রত্যেক সিদ্ধান্তে স্ত্রীর অংশগ্রহণকে না মেনে নেওয়া,অবহেলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সংসার ত্যাগ করে মৃণাল।গ্রামের মেয়ে মৃণাল-আধুনিক,রুচিশীল,ব্যক্তিত্বসম্পন্না ও গতানুগতিকতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী।মৃণাল যখন লিখেছে,'আমার একটা জিনিস তোমাদের ঘরকন্নার বাইরে ছিল,সেটা কেউ তোমরা জানোনি।আমি লুকিয়ে কবিতা লিখতুম।... সেখানেই  আমার মুক্তি,সেইখানে আমি আমি।'সে প্রমাণ করেছে সে শুধু 'মেয়ে মানুষ নয়,মানুষ ও বটে।
      কোথাও গিয়ে ব্যক্তি স্বাধীনতাকামী রবীন্দ্রনাথের  নায়িকারা এক হয়ে গেছে।এক হয়ে গেছে সকলের চাওয়া-এক প্রতিবাদী নারী হয়ে উঠেছে।রবীন্দ্রনাথ তাঁর রচনায় সেকাল নয়-একালের নারীর নতুন ভাবনা,নতুন চিন্তাধারার প্রেক্ষাপটে তাদের নির্মাণ করেছেন।নারী-আত্মপ্রত্যয়,আত্মগরিমায় উজ্জ্বল।

সাহিত্যের সেকাল ও একাল --- অরূপজ্যোতি ভট্টাচার্য

গণিত শাস্ত্রে জ্যামিতি একটা গুরুত্বপুর্ণ অধ্যায়। জ্যামিতি মূলত দু প্রকার। যেটা আমরা মাধ্যমিকের আগে পড়ি সেটাকে বলে ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি। ইউক্লিড্ কিছু সিদ্ধান্ত কে বিনা প্রমান মেনে নিয়েছেন। যেগুলোকে বলে স্বতঃসিদ্ধ। আর কিছু সূত্র প্রমান করেছেন ওই স্বতঃসিদ্ধ ধরে। যেগুলো কে বলাহয় উপপাদ্য। আর এই উপপাদ্য আর স্বতঃসিদ্ধ দিয়ে যা প্রমান করতে হয় সেগুলোকে চলতি কোথায় বলাহয় এক্সট্রা। সাহিত্য আর সমাজের সম্পর্ক অনেকটা এই উপপাদ্যের মতো। সাহিত্য সমাজের প্রতিফলন। এটা যদি সিদ্ধান্ত হয় তাহলে যুক্তি দিয়ে প্রমানও করা যায় যে সাহিত্য সমাজের প্রতিফলন। অনেকটা ওই উপপাদ্য প্রমানের মতো। খুব সংক্ষেপে প্রমান টা হলো - সাহিত্যের তাৎপর্য আর সমাজের সংজ্ঞা - এই দুই সমীকরণের সমাধান। সাহিত্যের তাৎপর্য লুকিয়ে আছে রস নিস্পত্তির মধ্যে। রস হলো একটা রাসায়নিক বিক্রিয়ার প্রোডাক্ট। যেখানে বাইরের সমাজ আর মনের ভাব এই দুই উপাদান বিক্রিয়া করে রস সৃষ্টি করে। সমাজের আলম্বন হলো বিক্রিয়ার অনুঘটক। তাই শুরুতেই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে সাহিত্য সমাজের প্রতিফলন। বিষয়টা অনেকটা বিজ্ঞানের মতোই যুক্তিগ্রাহ্য। 
মোবাইল টেকনোলজি সমাজে রেভোল্যুশন এনেছে দুহাজার সালের পর থেকে। দুহাজার সালের পর, বিশেষ করে যেদিন থেকে ফেইসবুক এসেছে, সেদিন থেকে - মানুষের কাছে পৌঁছনোটা অনেক সহজ হয়ে গেছে। অনেকেই কবিতা লেখে, অনেকেই গল্প লেখে আবার আমার মতো কেউ কেউ হিজিবিজি লেখে। আগে অনেকেই এই লেখা গুলো বইয়ের পাতায় বন্দী করে রাখতো। আজ ফেসবুকে ভাষা উম্মুক্ত। নানান রং র ছবির কোলাজের মাঝে লেখার প্রেসেন্টেশন। অনেকেই লেখে। সবার লেখা মনে দাগ না কাটলেও কেউ কেউ বেশ ভালোই লেখে। অনেকেই পড়ে। লাইক, রিমার্ক কতকিছু। ঝা চকচকে প্রেসেন্টেশন। শুধু একটাই প্রশ্ন থাকে লেখাগুলো মনে কতক্ষন স্থায়ী হয় ? আবার একটা নতুন পোস্ট, নতুন মুড্। 
যদি সময়টা একটু পিছিয়ে যাই, মানে দুহাজার সালের আগে, তখন কেমন ছিল সাহিত্য ! কিছু সাপ্তাহিক বা মাসিক পত্রিকা। অথবা বই লেখা। প্রেসেন্টেশন মানে বইমেলা। এরই মধ্যে লেখককে পৌঁছতে হবে পাঠকের মনে। আর সেটা না হতে পারলে সব চেষ্টাই মাটি। লেখকের দায়িত্ব পাঠক কে দিয়ে পড়িয়ে নেয়া। মানে বই কিনতে বাধ্য করানো । সেটা ভালোলাগার টানে, ভালোবাসার টানে। সেদিন সমাজ আমাদের দিয়েছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সঞ্জীব চট্টপাধ্যায় এনাদের মতো সাহিত্যিক। যাদের লেখা বার বার পড়েছি। বই কিনে পড়েছি। পূজাবার্ষিকী খুলেই আগে এনাদের লেখা পড়েছি। এমনকি পান্ডব গোয়েন্দা বা কিকিরা এইসব চরিত্র মনে দাগ কেটে গেছে। কবিতার কথা বললে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, জয় গোস্বামী, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এনারা আজকের দিনেও প্রাণবন্ত। কি ছিল তাদের লেখাতে ? খুব সহজ কোথায় বললে ওনাদের লেখা মনে দাগ কেটে যেত। একবার পড়তে শুরু করলে আর থামা যেত না। খাবার টেবিলে, রাতের বেলা শুয়ে শুয়ে, বা টেক্সট বই এর মধ্যে লুকিয়ে। বাবা মার বকুনি, স্যারের মার সব কিছু উপেক্ষা করে পড়েছি। ভুল বললুম। লেখাগুলো পড়িয়ে নিয়েছে। আমরা পড়িনি। আমাদের পড়িয়ে নিয়েছে। বয়সের সাথে সাথে সমাজের পরিবর্তন যেন মনের কোনে উঠে এসেছে, আর মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ইচ্ছে গুলো ডানা মেলে উড়ে গেছে। রস নিস্পত্তি। ভাব আর বাইরের জগৎ বিক্রিয়া করে যে রস উৎপন্ন করেছে সেটা মনের সাথে মিশে গেছে। বিজ্ঞানের ভাষায় দ্রবীভুত হয়। 
আর একটু পিছিয়ে যাই রবীন্দ্রনাথের যুগে। ছোটগল্প নিরুপমা। বিষয় পণপ্রথা। এবার বিশ হাজার পন আর হাতে হাতে আদায়। সামান্য একটা লাইন। একশো বছর পরও যার তাৎপর্য প্রাসঙ্গিক। মনের কোনায় যে রস ছড়িয়ে দেয়', সেটা জানায় - বেদনার কি ভাষা। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মহেশ। আজকেও পড়লে চোখে জল আসে। দেবদাস। একটাই প্রশ্ন জাগায় - ভালোবাসা করে কয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আর পদ্মানদীর মাঝি। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। এনারা কালজয়ী। কারণ একটাই। এনাদের লেখা সমাজের বাস্তবের সাথে মনের যন্ত্রণার সংযোগ ঘঠায়। কেমিক্যাল রিঅ্যাকশন। লেখা পড়তে হয় না। লেখক পড়িয়ে নেন। একবার নয় বার বার। আর বারবার আসে নব অনুভূতির সজীবত্ব। 
আজ আমরা বাচ্চাদের বলি মোবাইল এডিক্ট। আমরা নিজেরাও এডিক্ট। আজকে ছোট বড়ো সবারই মন অস্থায়ী। টি ভি তে সিরিয়েল দেখলে দেখা যাবে একজন মহিলা আদা জল খেয়ে পেছনে পড়ে আছে আর এক মহিলার ক্ষতি করতে, আর অন্যদিকে ছেলে মানেই নারী বিদ্বেষী নাহলে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির । আমরাও গোগ্রাসে গিলছি সেই সিরিয়াল। আমাদের মনের আবেগ গুলো আজ ভীষণ জটিল সমীকরণের মাঝে সমাধান খুঁজে পায়না। আর তাই ঘুরতে থাকে ঘূর্ণাবর্তে। যিনি লিখছেন তিনি নিজেই কনফিউসড। নিজের কাছেই পরিষ্কার নন কি ঠিক আর কি ভুল। শুধু কিছু আবেগকে ভাষায় পরিণতি দেয়া। দোষ আমাদের। আজকে লেখক লেখা পড়াতে চান। পড়িয়ে নিতে পারে কি ? সমাজের প্রতিফিলন সাহিত্যে আসে কি ? ঘটনার প্রতিফলন আসে। ব্যঞ্জনা জাগে না। লেখা সুন্দর লেখার হাত সুন্দর। হাতের লেখা সুন্দর। শুধু অভাব রাসায়নিক বিক্রিয়ার। হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন মিসলেই কি জল হয় ? বাতাসে অক্সিজেন আর নাইট্রোজেন আছে। তবু বিক্রিয়ার জন্য চাই বিদ্যুৎ। সেই বিদ্যুতের ঝলক কোথায়। শুধু শব্দের গুড়গুড় রব । অনেকে আছে হিউমান সাইকোলজি হিসেব করে লেখেন। সুন্দর লেখা। শুধু বিভাব আর অনুভাবের সংযোগের বড়ো অভাব। তাই রস আর নিস্পত্তি হয় না। লেখা হারিয়ে যায় বইয়ের পাতায় বা থেমে থাকে ফেসবুকের ওয়াল এ। অন্ধকার আসে শরীরের মিলন হয়। শুধু মুখোমুখি বসার জন্য বনলতা সেন আর নেই। 

বৃহস্পতিবার, ৩০ মার্চ, ২০১৭

হেই ঝ্যে বাঙালী ---- প্রদীপ্ত দাস

'না দাদা, আমি ইচ্ছে করে আপনাকে ওরকম বলিনি। অনেকসময় রিস্ক থেকে যায় না! তাই, বাসে একটু দেখেশুনে উঠবেন তো... একবার গেলে, লাইফটাতো চলেই গেলো বলুন...' এক নিঃশ্বাসে বলে থামলো কন্ডাকটর।
সে কন্ডাক্টরের আরো অনেক দাবী। যেমন বললো, 'ওই যে কানে ইয়ারফোন গুঁজে সব ঘোরে, কান তো যাবেই, সাথে ব্রেন ড্যামেজ হয়ে পাগলাও হয়ে যেতে পারে; আর এক্সিডেন্ট! হলেই ব্যাস। বাপ্-মায়ের রত্ন, স্বর্গে গান শুনবে শালা...' ঠিকই বলেছে কিছুটা। আমার তো শুনে ভালোই লাগলো। আমার পাশে একটা ১৭-১৮ বছর বয়েসী ছেলের কানে গোঁজা ইয়ারফোনের ভলিউমটা বোধ হয় একটু কম ছিল। সে "'coldplay'-আর 'S.O.A.D' শুনি, সব জানি; বেশি শিখিও না" গোছের একটা হাব-ভাব নিয়ে হুব্বার মতো ফিচেল হাসছিলো।
যাক গে, একটু পরে একজন বাসের গতির বিপরীত মুখে নামতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে আর কি... কন্ডাকটর বলে, 'দাদা, নিউটনের গতিসূত্র পড়ে বাসে উঠবেন। শালা, শুয়ার। এদের সবকটার বেসিক শিক্ষাটা দিয়ে নিতে হবে আগে।'
আমি ভাবলাম, না, খারাপ না। ঠিকই তো বলেছে। বেশ ভালো কন্ডাকটর। একটু পরেই দেখি, ইয়ারফোন কানে গোঁজা হুৱা নামার জন্যে দাঁড়িয়ে; টাল না ইয়ারফোন কোনটা সামলাবে বুঝতে না পেরে প্রায় পড়েই যায়... এবার কন্ডাক্টরের পালা। সে ছেলেটিকে ধরে নিয়ে বললো, 'সামলাও, সামলাও। এইবার সামলে নিতে শেখো।'
আরো কিছু পর, বাঁদিক থেকে একটা বাইককে হাত দেখানোর পরেও না দাঁড়িয়ে হুড়মুড়িয়ে চলে আসায় কন্ডাক্টরের সে কি খিস্তি! কাঁচা... raw... বাসের ভেতর থেকে একজন বলে উঠলো, 'আরে, খিস্তি কোরো না। ওরা যা পারে করবে। পার্টির লোকাল লোক হয় যদি!' কন্ডাকটর বলে, 'পার্টি ফার্টি বুঝিনা দাদা... আইন মেনে বুঝি প্রতিবাদ...'
আমি ভাবলাম, 'বেশ তো। দম আছে মালটার। গুড। বাঙালীর দম। নেতাজির মতো দম। অন্ততঃ ভালো করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে দ্বিধা নেই...'
বাসটা গন্তব্যে পৌঁছালো। কন্ডাকটরও নেমে পড়লো। যাত্রীরা সব নামছি... এক যাত্রী প্রায় ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো, 'শালা, কন্ডাক্টরটা শিওর গাঁজাখোর...'। বুঝলাম, 'বাঙালী। পেছনে কথা বলা বাঙালী।'
[আপনারাও বলছেন জানি, "যে লিখেছে সেও 'বাঙালী, ভেবে ভেবে হয়রান বাঙালী']

নারী – আমাদের জীবনের রস এবং মাধুর্যের একমাত্র উৎস --- সুধাংশু চক্রবর্ত্তী

সিন্ধুসভ্যতার যুগ থেকে আধুনিক ভারতে মাতৃশক্তি পূজিত হয়ে চলেছে । আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগেও ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে ও সমস্ত আর্য অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে ধর্মের একটি প্রধান অঙ্গ ছিলো শক্তি উৎসরূপে মাতৃদেবতার পূজা । একসময়ে আদিম মানবের ভাবনায় এসেছিলো , শুধুমাত্র নারীর বুকেই স্তন্যক্ষীরধারা প্রবাহিত হয় কেন ? নারীর মধ্য থেকেই নতুন জীবনের সূচনা হয় কেন ? জন্ম নেয় এক নতুন মানব ! আদিম মানুষেরা ছিলো প্রকৃতির খেলার বস্তু । প্রকৃতির খেয়াল এবং প্রকৃতির দুর্যোগকে তারা ভয় পেত । তখনকার সেই রুক্ষ, রসহীন, মাধুর্যহীন জীবনে রস ও মাধুর্যের একমাত্র উৎস ছিল নারী । তারা নারীর কাছে পেতো স্নেহ, মমতা, মানসিক ও শারীরিক আশ্রয় এবং আনন্দ । তারপর আদিম সমাজ যখন কৃষি নির্ভর হয়ে পড়লো তখন বীজবপন থেকে শস্য-সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ ইত্যাদি বিষয়ে নারীই ছিলো অগ্রণী । এতে নারী হয়ে উঠেছিলো পরিবার তথা গোষ্ঠীর প্রধান । যখন বিবাহ সম্পর্ক প্রবর্তিত ও স্বীকৃত হয়নি সমাজে তখন স্ত্রীপ্রাধান্য ছিলো । নারী ছিলো স্বাধীন । মায়ের পরিচয়েই সন্তানের পরিচয় চিহ্নিত হতো । বিবাহ সম্পর্ক প্রবর্তিত ও স্বীকৃত হবার পর মানব সমাজে ক্রমে ক্রমে পুরুষপ্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে । ধনসম্পদ পুরুষের অধিকারে আসে । পুরুষের সম্পত্তিরূপে পরিগণিত হতে থাকে নারী ।

নারী তারপর থেকে ক্রমেই কোণঠাসা হতে থাকে এই পুরুষপ্রাধান্য সমাজে । তাঁরা নানা ভাবে লাঞ্ছিত হতে থাকে পুরুষের কাছে । বর্তমানে সেই নৃশংসতার বহর প্রতিনিয়ত চূড়ান্ত ভয়াবহতার বাঁধ ভাঙছে । বর্তমানে নারীরা বাড়ির বাইরে পা রেখেছে । আজকের নারী লিঙ্গভিত্তিক শ্রম বিভাজনের পরিধি ভেঙে বেরিয়ে বেরিয়ে এসেছেন শুধুমাত্র সংসার এবং পেটের দায়ে । শিক্ষিত মহিলা কম্যান্ডো , পাইলট, মহাকাশচারী , ইঞ্জিনিয়ার , ডাক্তার , জজ ম্যাজিস্ট্রেট , স্কুল-কলেজের শিক্ষিকা , রাজনৈতিক নেত্রী ইত্যাদি হয়েছেন । এই নারীই স্টেশনে এবং ট্রেনে হকারি করছেন , বাজারে সবজি বিক্রি করছেন , গৃপরিচারিকা , রাঁধুনি ইত্যাদি পেশা বেছে নিয়ে নিজেদের সংসার সামলাচ্ছেন এবং সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ তৈরি করছেন ।

এতো কিছুর পরও লিঙ্গবৈষম্যের ফেরে কর্মক্ষেত্রে বা অন্য কোথাও নারীর পিছিয়ে পড়া চোখে পড়ছে বর্তমান বিশ্বে । সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে প্রকাশ পায় যে , কর্মক্ষেত্রে মহিলারা পুরুষদের চেয়ে অন্তত ২০ শতাংশ কম বেতন পান । তবে বর্তমানে অনেক নারী সমস্ত প্রতিকুলতা সত্ত্বেও মাথা তুলে দাঁড়ানোর লড়াই ছাড়ছেন না । এরাই আজকাল বাল্যবিবাহ রুখে চলেছেন যা হয়তো নারী দিবসের এক আন্তরিক পাওয়া । 

আজ এই নারী দিবস পালন করার সাথেসাথে আমাদের হয়ে উঠতে হবে একজন প্রকৃত মানুষ । ঝেড়ে ফেলতে হবে নারী পুরুষের বাহ্যিক আবরণ । নারী এবং পুরুষ - উভয়ের মধ্যে বিশ্বাস থাকাটাও খুবই জরুরী । সেই বিশ্বাসেই নারীকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করার বস্তু বলে মনে করবে না কোনো পুরুষ । পণ প্রথা নামক সামাজিক কুসংস্কারের বলি হয়ে প্রাণ দেবে না কোনো নারী । বাসে ট্রেনে ট্রামে পুরুষের কদর্য ইঙ্গিত এবং ব্যবহারের সন্মুখীন হতে হবে না নারীকে । নারী বাজারে বিকোবে না সস্তার পণ্য হিসেবে । বন্ধ হোক বিজ্ঞাপনে নারীকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা । আমরা ভুলে যাবো কেন এই নারীই কিন্ত পুরুষের স্নেহ, মমতা, মানসিক ও শারীরিক আশ্রয় এবং আনন্দের আঁধার । নারীই আমাদের সমাজ ও জীবনের শ্রেষ্ঠ স্থপতি । 

সোমবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

ছিন্নমূল বাঙালির প্রিয় সাংস্কৃতিক ঋত্বিক ---- সিলভিয়া ঘোষ

তখন সাদা কালো টিভির জামানা।ক্লাস সেভেন কি এইটে পড়ি,তখন কলকাতা দূরদর্শনের থেকে সম্প্রচারিত হতো Retrospective।সেই সময় বাবা কে দেখেছিলাম টানা ছয়দিন রাত জেগে ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা দেখতে এবং নাগরিক আর মেঘে ঢাকা তারা দেখে চোখের জল লুকাতে।সেই সময় জিজ্ঞাসা করেছিলাম বাবা কে তুমিও কাঁদছো ? বাবা বলেছিলেন --'যে শিল্প বা সংস্কৃতি মানুষের বাস্তব সমস্যা কে সকলের সামনে এনে দাঁড় করায় আর যেখানে প্রতিটি মানুষ ঐ শিল্পের মধ্যে দিয়ে নিজের জীবনের মিল খুঁজে পায় সেখানেই নাট্যকার বা চিত্র পরিচালকের সার্থকতা ।ঋত্বিক সেই কাজটা করে দিয়েছিলেন।সেক্ষেত্রে তিনি সার্থক একজন শিল্পী ।কথাটা সেই সময় ওতোটা বুঝি নি।আজ বুঝি ।
আমার দেখা ঋত্বিকের 'কোমল-গান্ধার ' ও 'মেঘে ঢাকা তারা' সবচেয়ে প্রিয়।আসলে ঋত্বিক নিজে কোনদিন দেশভাগটা মেনে নিতে পারেন নি।তাই তার ছবির মূল বিষয় ছিল উদ্বাস্তু কলোনি।যেখানে নীতার মতোন সর্বংসহা মেয়েরা পরিবারের সুখ শান্তির জন্য নিজের ভালোবাসা কেও বোনের হাতে তুলে দিতে কুন্ঠাবোধ করেনা।একা তার প্রচেষ্টায় যখন সংসারের সকলে সুখের মুখ দেখলো তখন একটু একটু করে ক্ষয়ে যাওয়া নীতা সংসারে ব্রাত্য হয়ে পড়ে।অবশেষে যখন গায়ক দাদা তাকে সুস্থ করতে পাহাড়ে নিয়ে যায় তখন মৃত্যু আসার আগে দাদা কে একটা কথাই বলে যা পাহাড়ের গায়ে প্রতিহত হতে থাকে--'আমি কিন্তু বাঁচতে চেয়েছিলাম দাদা'।এই কথাটা একটা সিম্বল।এই এতো কষ্ট এতো অভাবের তাড়নার সাথে লড়াই শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্য অথচ পারছি না কেউ।

আমার প্রিয় সিনেমা ---কোমল গান্ধার ।এই ছবিতে পরিচালক গণনাট্যের মাধ্যমে ছিন্নমূল মানুষের অভাব অভিযোগ ,ফেলে আসা পদ্মার পাড় এমন কি মুর্শিদাবাদের কাছে ছিন্ন হয়ে থাকা রেলপথ টাও যেন সাক্ষী হয়ে থাকছে দুটি ছিন্নমূল মানুষের জীবন সূত্র বেঁধে দেবার জন্য ।

তাঁর মতে ---নাটক , থিয়েটার যতদিন মানুষের কাছের ছিল ততদিন তিনি সেটির মাধ্যমে সমস্ত সমস্যার প্রতিবাদ করেছেন,এখন যখন চলচিত্র মানুষের অনেক কাছে এসে গেছে তখন সেটির মাধ্যমেই সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরবেন।আগামী তে এর থেকেও যদি কিছু শক্তিশালী জনমাধ্যম গড়ে ওঠে তখন সিনেমাকেও লাথি মেরে ঐ মাধ্যমে ই কাজ করবেন।
তাঁর তৈরি সিনেমা হল----বাড়ি থেকে পালিয়ে ,অযান্ত্রিক, নাগরিক ,সুবর্ণরেখা ,যুক্তি তক্কো গপ্প,তিতাস একটি নদীর নাম ইত্যাদি ।সময়ে থেকে অনেক আগের দৃষ্টি ভঙ্গি ছিল তাঁর ,তাই মৃত্যুর এতো বছর বাদেও তাঁর ছবিগুলো থেকেই ফিল্ম উৎসাহী স্টুডেন্টসরা অনেক কিছু শিখে চলেছে।

শ্রী জগন্নাথ বসুর কথায় ---'ঋত্বিক ছিলেন আপাদমস্তক অগোছালোর মধ্যে সৌন্দর্যের প্রতিমূর্তি'।

আজ তার প্রয়াণ দিবসে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই

মঙ্গলবার, ৮ নভেম্বর, ২০১৬

নৈঃশব্দ্য -- লুতফুল হোসেন

চারপাশে নানান রকম গাড়ী। কখনো চলছে, কখনো থেমে থাকছে। মিছিলের মতো হাত ধরাধরি করা ভীড়। হরেক তাদের নাম, আকার, আকৃতি, রঙ, উপযোগ। তেমনি বিচিত্র তাদের চটা কিংবা চকচকা শরীর। আর শব্দশৈলী তো বলিহারি। ভ্যাঁ ভোঁ ঘ্যাচঙ ঘোঁৎ গুম-গুম হুম-হুম ঘরর গররর ঘ্যাঁচ ক্যাঁচ ক্যাঁচ; প্যাঁ পোঁ পিইই পিইইইই প্যাঁ প্যাঁ পিপ পিপ বিপ বিপ বোঁওও পিঁয়াও ওঁ ওঁ উঁ উঁ ...
মনে হচ্ছে কোনো আনন্দ মিছিল নেমেছে বুঝি পথে। কখনো সখনো এর গায়ে ও ঠুকে দিচ্ছে ওজর-আপত্তি-বিহীন হুমড়ি খাওয়া পতন। কখনো ঘষটে দিচ্ছে আরেকজনার মাখন মাখা শরীরজোড়া যতন। একসঙ্গে শহর জুড়ে মেতেছে সাড়ে তিন লক্ষ যানবাহন। বিরতিহীন জ্বালানী পোড়ানো পীচঢালা পথময় সন্তরণ।
যতোক্ষণ থেমে থাকে হৈ হুল্লোড় কিছুটা কম বটে তাদের। তখন আবার যোগ হয় কিছু দাদরা ঝুমুরের মতোন প্যানি ঠাণ্ডা প্যানি, আলুর চিপস, বই নিলে দুইশো-তিনশো, বেলীইই ফুল, দোলনচাঁপা এই দোলনচাঁপা। জায়গাটা যদি হয় ট্রাফিক সিগন্যালের কাছাকাছি কোথাও।
এর মাঝেই কোনো বাহনের ভেতর থেকে রেডিও টুডের খবর, কোথাও এবিসি রেডিওর কথামালা, গানের সুরে এফএম এইটি নাইন, রেডিও ফুর্তির ড্রামবিট কিংবা কোথাও জর্জ হ্যারিসন কোথাও বাপ্পা কিংবা জেমস বা রেকর্ড সংখ্যক গানের শিল্পী মমতাজ। এদের সবারই মুডটা এমন যেনো ঠিক পিকনিকে রওনা হয়েছেন বা প্লেজার লং ড্রাইভ। বাকীদের চেহারা কোষ্ঠকাঠিন্যের রোগীর মতোন বক্ররেখার প্লাবন।
এর ভেতরই দু ঘন্টায় এক কুড়ি কিলোমিটার পথ পাড়ি দেবার যাত্রীরা কেউ ঘুমায়, কেউ ঝিমায়, কেউ হয়তো কিছু একটা পড়বার চেষ্টায় মরিয়া হয়। তাদের সামনে মেলে ধরা কবিতার লাইনে শঙ্খচিলের ডানায় ঢুকে পড়ে পাশের হিউম্যান হলারের গায়ে এক্রোব্যাটের মতোন ঝুলে থাকা হেল্পারের তারস্বরে চিৎকার, চাইপা বহেন - ফার্মগেট নামলে রেডী থাহেন। হয়তো ছোটগল্পের ভেতর মনসুরার মেয়েটি যখন মায়ের একাকী জীবনের ডায়ালেকটিক্সে নিজের নতুন প্রেমের সম্ভাব্য পরিণতির ছবি আঁকছে তখন পাশের সিএনজি স্কুটারের যাত্রীটি তীব্র চিৎকার করে ওঠে। ছিনতাইকারীর ছুরিতে হুড কেটে তার মোবাইল আর ব্যাগ নিয়ে গেছে কারা।
কেউ একজন ভাবছিল অফিসের কাজে দেরীর জবাব কি দেবে আনকোরা, কেউ ঘরে অপেক্ষমান সন্তান বা বাবা মা'কে ঘিরে ভাবছে জটিল কিছু, কেউ স্বপ্ন বুনছে সম্ভাবনাময় আগামীর কোনো এক দিনের। ট্রাফিক সিগন্যাল ছেড়ে ক্ষণিকের জন্য বেগবান শব্দ মিছিলে জোরদার ঐকতান ঘিরে ছুটতেই বিকট শব্দে একাধিক বাহন বুঝি হুমড়ি খেলো একসঙ্গে। সাথে উঠে এলো তীব্র আর্তনাদ। শব্দটা একটা আস্ত হিমালয়ের মতোন রাজপথের গোটা সীমানা জুড়ে সমস্ত মানুষ ও বাহনের মাঝে আছড়ে পড়েই থমকে গেল যেনো।
অকস্মাৎ সব নিস্তব্ধ শুনশান। দীর্ঘক্ষণ শব্দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পিনপতন নিরবতায় মিশে থাকলো সবকিছু সেলুলয়েডে ফ্রিজ শটের মতো। ... অনেক পরে বাহন সচল হয়ে একে একে নীরবে পার হয়ে যেতে থাকলো সেই ফ্রিজশটের ফ্রেম থেকে ... তার সীমান্তে পড়ে আছে মুখ থুবড়ে একজন পুরুষ, একজন নারী ও একটি শিশু তাদের ঘিরে ফ্রেমটা তখনো বাঁধানো শেষ হয়নি ... তাজা রক্ত গড়াচ্ছে তাদের ঘিরে - যেনো কোন অদৃশ্য তুলিতে কেউ খুব দ্রুত শেষ করবে এখুনি, এই এখুনি ... ওখানে স্থির থাকবে তিনটে মানুষ তাদের স্বপ্ন আর পৃথিবীর রঙ ... লাল, ভীষণ লাল, রক্ত জমাট বাঁধলে তা আরো গাঢ় হবে ... কটকট করে তাকিয়ে থাকবে ... কেউ কিচ্ছুটি বলবে না ... শুধু তাকিয়ে থাকবে মাছের মতোন শূন্য দৃষ্টিতে ...
ফ্রিজশট জুড়ে শুধু পড়ে থাকবে অপার নৈশব্দ।

বিশেষ দিবস হ্যালোউইন -- সিলভিয়া ঘোষ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আঁৎকে উঠলেন। হোয়াইট হাউজের বাইরে দেখেন চারদিকে ভূতুড়ে পরিবেশ। বিশাল বিশাল দৈত্য, কুমিরের প্রতিকৃতিতে হোয়াইট হাউজের আঙিনা ছেয়ে গেছে। হোয়াইট হাউজে হঠাৎ ভূত কেন-সবার মনে প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক। অক্টোবরের শেষদিনে ইউরোপ আমেরিকায় হ্যালোইন পালন করা হয়। যত ভূত-প্রেত আছে, সবাই নাকি এই রাতে লোকালয়ে চলে আসে। আর সেই সব ভূত-প্রেতদের খুশি করতে না পারলে বিপদ। আর সেজন্য এই রাতটিতে পালন করা হয় হ্যালোইন উৎসব।
কোথা থেকে এই হ্যালোইনের উদ্ভব:
---'-----------------------------------
যদি আমরা প্রাচীন সভ্যতাগুলির দিকে ভালো করে নজর দিয়ে থাকি তবে দেখতে পাবো-- পৃথিবীর সৃষ্টির আদিতে যেমন সূর্যের ভূমিকা অনস্বীকার্য ঠিক তেমন ই তার প্রভাব পড়েছে প্রাচীন ধর্মের উপর এমন কি দিনক্ষণ, তারিখ,ক্যালেন্ডার সব তৈরি হতো সূর্য কে কেন্দ্র করেই।তাই এই সময় আমাদের যেমন নতুন ধানের চাষ হয় ঠিক তেমনই পৃথিবীর বিভন্ন প্রান্তে এই সময় চলে নতুন শস্যকে কেন্দ্র করে তার বন্দনা এবং প্রাচীন দিন পঞ্জিকা অনুযায়ী ৩১ শে অক্টোবর বছরের শেষ দিন ধরা হয়ে থাকতো বলে একটা দিনকে সকল বিপদ সকল মৃত্যু ভয়ের থেকে দূরে রাখতে চাইতো বলে এই উৎসবের সূচনা।প্রাচীন গ্রিক সভ্যতায়,শস্যের দেবীর মতোই,মাতৃদেবীর পূজোর একটি প্রবল ধারার প্রমাণ রয়েছে , যেখানে দেবী মাতা শক্তি ,সুরক্ষা ,রক্ত ও বিজয়---এসবের প্রতীক।ইউরোপের জিপসিরা এই মাতৃশক্তিকে মৃত্যুর দেবী হিসাবে পূজা করে এসেছে,ঠিক যেমন আমরা শ্মশান কালীরপূজা করি।প্রাচীন ফিনল্যান্ডেও 'কালমা' নামে এক কৃষ্ণাঙ্গ দেবী ছিলেন ,তিনিও সমাধিস্থলে ঘুরে বেড়াতেন এবং মৃতদেহ ভক্ষণ করতেন।রোমানরাও ধরিত্রী মাতার আরাধনা করতেন এবং তার রঙ ও কালো।আমাদের মহাভারতেও এক কৃষ্ণ বর্ণ দেবীর কথা বলা হয়েছে যাকে শবর ,পুলিন্দা এবং বর্বর'রা তাঁর পূজা করত ,সেই পূজায় রক্ত অর্পণের প্রথা ছিল।সুতরাং এইটা বলা যেতেই পারে আমাদের ভূত চতুর্দশী আর হ্যালোইন হয়তো এই এক কারণেই সৃষ্টি।ভাগ্যক্রমে এইবার দুই তিথির সমন্বয় ঘটেছে।
বর্তমানে হ্যালোইন উৎসবের গুরুত্ব
:-----------------------------------
প্রতি বছর ৩১ শে অক্টোবর Halloween উৎসব পালিত হয়। গ্রেট ব্রিটেন ও আয়ারলান্দে এই উৎসব প্রাচীন উৎসব হিসাবে পালন করা শুরু হয়েছিল যা প্রধাণতঃ ব্রিটিশ, আইরিশ, স্কটিশ জাতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু জনপ্রিয়তার কারণে তা উঃ আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপে ভীষণভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে ইংরাজি মাতৃভাষার সব প্রদেশের/জাতির মধ্যে এই উৎসব পালিত হয়। মৃত পূর্বপুরুষের আত্মার সঙ্গে বর্তমানে জীবিতদের যোগাযোগের দিন এবং ফলস্বরূপ অলৌকিক কিছু ঘটনা ঘটবে এই দিনে, এমন একটা বিশ্বাস থেকে এই উৎসবের সূচনা হয়। বর্তমানে বিশেষ Halloween পোশাক, ভূতের সিনেমা দেখা, ভুতুড়ে বাড়িতে যাওয়া এবং বিভিন্ন অপ্রাকৃতিক ব্যাপারের সঙ্গে জড়িয়ে থেকে আনন্দ করাটাই মূল উদ্দেশ্য। শিশু, কিশোরেরা পোশাক পরে প্রতিবেশীদের দরজায় দরজায় যায় এবং মিষ্টি, চকোলেট, অন্যান্য উপহার এবং টাকা পর্যন্ত সংগ্রহ করে। কোন কোন পরিবারে পার্টি হয়।
হ্যালোইন পালন নিয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় মাতামাতির শেষ নেই। রাতটি উদযাপনে সেখানে প্রস্তুতি চলে মাসজুড়ে।তারপর হ্যালোইনের রাত নামার সাথে সাথে শুরু হয়ে যায় উদযাপন। দিনের আলো নিভে যাওয়ার সাথে সাথেই শিশুরা দল বেঁধে বেরিয়ে পড়ে। সবার গায়ে থাকে রাজ্যের অদ্ভূতুড়ে কস্টিউম। আর হাতে থাকে টর্চ। অনেকে আবার বাড়ির উঠোনকে ভৌতিক বানিয়ে ফেলে। কেউ মাকড়সার জাল বানিয়ে তাতে কঙ্কাল টাঙিয়ে দেয়। মিষ্টি কুমড়া দিয়ে ভূত বানানো তো খুবই জনপ্রিয়। বড় বড় মিষ্টি কুমড়ার ভেতরটা ভালোভাবে পরিষ্কার করা হয়। তারপর কুমড়ার খোলের গায়ে বানানো হয় চোখ-মুখ। ভেতরে জ্বালিয়ে দেয়া হয় বাতি।
এখন ইউরোপ আমেরিকা ছাড়িয়ে জাপান,অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এমনকি বাংলাদেশেও এই উৎসব উদযাপন করা হয়। ইউনিসেফ ও উৎসবটি উদযাপন করে। তাদের সাথে মুক্ত শিশুদের অনেকেই এদিন ভূত সেজে ট্রিক আর ট্রিট খেলায় ছলে সংগ্রহ করে তহবিল। আর সে তহিবল ব্যয় হয় শিশুদের জন্য। হ্যালোইন উৎসব শুধু ভূত-প্রেত নয়, এখন কল্যাণকর কাজে উদযাপিত হচ্ছে। উৎসবে শিশুরা পায় নির্মল আনন্দ।

শুক্রবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

শব্দে বাঁধা স্মৃতি - পিয়ালী বসু ঘোষ

উত্তর কোলকাতার কাছেই একটা লম্বাটানা বারান্দাওয়ালা বাড়িতে আমার কৈশোর স্মৃতি রয়ে গেছে এখনও--জাফরি কাটা সিঁড়ির জানলার ওপারে ! 
আচারের বয়ামগুলো যেখানে বেলাশেষের রোদে লোলুপ চোখে আমাদের দিকেই চাইত। ঝুপ করে নেমে আসা সন্ধ্যায় ছাদের ঘরের ছোট্ট খুপড়িতে নারকোল পাতাগুলো নুয়ে পড়ত সোহাগে। আমরা তখনো ন্যাড়া ছাদের নিচটায় লুকোচুরি খেলছি। টুন'দি, বয়ি'দি, দীপু, রিং, পিং . . . এখনও যেন শুনতে পাচ্ছি মা ডাকছে নিচ থেকে, আয় নীচে নেমে আয় বলছি---ভূতে ধরবে ! 

বুড়ি দিদিমা মারা গেছেন তখন সদ্য। ভয় পেতাম, গুটি গুটি নেমে আসতাম শব্দহীন পায়ে ! 
টুন'দি বলত, শুনছিস নূপুরের আওয়াজ হচ্ছে--বলতাম ধুর ! এদিকে সারা শরীরে তখন কাঁটা !
সে সময়ে দূরদর্শনের প্রভাবে আমরা দেখতে শিখে গেছি ভূতের ছবিতে নূপুরের শব্দ হয়, মোমবাতি হাতে বড় বড় নাচমহলের আড়ালে নায়িকারা গান গায়। মনের মধ্যে তারই প্রভাব ছিলো বোধহয়। 
তরতরিয়ে নীচে নামতেই মা চুলের মুঠি ধরে বলত, ধিঙ্গি মেয়ে পড়তে বসবি কখন ? 

স্বপ্নের মতো ভিড় করে আসছে স্মৃতিরা, শৈশব কৈশোরের বেহিসাবি উজ্জ্বল দিনগুলোর স্মৃতি, এলোমেলোভাবে---বর্ষা বিদায়ের বৃষ্টির মতো। 
আমার ছোটোবেলার সেই লম্বা টানা ছাদ আর তার দেয়ালে বরফি কাটা ফাঁক দিয়ে দেখতে পাওয়া এক অন্য আকাশ। শৈশবের লাল-নীল স্বপ্নের আর আবোল তাবোল ইচ্ছের আকাশ। ওই আকাশের হ - য - ব - র - ল'র নীচে একবার আমরা "সিন্দ্রেল্লা" করেছিলাম। আজ একলা ঘরে বন্ধ জানলার ফাঁকে দেখা স্বল্প আকাশ মনে করায় সেদিনের অবুঝ আবেদনের কথা। 

আরও কত কথা ! সেই বয়েসের কিছু পরেই ওই ছাদেই প্রেম হয়েছে পাশের বাড়ির ভিনদেশীর সাথে। তখন বরফি কাটা ছাদের ফাঁকগুলো দিয়ে সোহাগী রোদ্দুর আসত নেমে। 

এক বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে ছাদের আড়ালে জম্পেশ ইশারা চলছে, হঠাৎ মা কখন পিছনে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করিনি। বিনুনী বেঁধে স্কুলে যাবার নিয়ম ছিলো তখন। মা ওই বিনুনী ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে এসেছিলো নীচে। 
এখন হাসি অবুঝ কৈশোরের কথা মনে করে ! কিন্তু কিছু কিছু লবণবিন্দু দেখি এখনও লেগে আছে আমার অনবধানের গালে !

মঙ্গলবার, ৩০ আগস্ট, ২০১৬

আমার প্রিয় কবি -- লাভলী বসু

"শোকের সাথে আড়ি সত্যি দিতে পারি 
ডুয়ার্স যখন সাকিন আমার , আমার বাসাবাড়ি l "


এই অকপট স্বীকারক্তি ডুয়ার্সের কবি --অমিত কুমার দের ---আমার অন্যতম প্রিয় কবি l আজকের আধুনিক নগরকেন্দ্রিক সভ্যতায় যেখানে হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ , পাখি , নদী ,পাহাড় , চা -বাগান ,কবিতায় সেখানে সহজ হবার মন্ত্র শেখায় পাহাড়ীনদী ও ঝর্নার জল ,জংলি ফুলের গন্ধে ফুসফুসে ঢুকে পড়ে , পাহাড় পাঠ করে মেঘেদের চিঠি , পাখিরা পালক উপহার দিয়ে কাছে রাখার আকুতি জানায় পাঠকের কাছে আর সেই অবসরে ছন্দের মায়াবী নকশীকাঁথায় কবি ছুঁয়ে যান পাঠকের মনন --
"নিবি আমায় ? নে না ---
দেখবি তখন আমি যে তোর আর জনমের চেনা l "


ভার্চুয়াল জগতে এসে আমি আরও একজন প্রিয় কবিকে পেলাম তিনি --পিয়ালী বসু l তাঁর লেখনীর অসামান্য দক্ষতা প্রতিনিয়ত আমায় নারী হিসেবে নিজেকে নতুন করে চেনায় ---


"শোষন ও শয়ন প্রক্রিয়ার মধ্যস্থতায় 
উন্মুক্ত হয় অন্য এক নারীজন্মের ইতিকথা l "


তাঁর অসাধারন সাহসী ও আধুনিক লেখনীতে খুঁজে পাই জীবন দর্শন -----
"মৈথুনের সংলাপে আলোড়িত 
'সুইসাইড নোট ' লেখা শুধু 
its not about the love you had 
but 
about the lovers you had."
------------ নতুন করে অন্যভাবে ভাবতে শেখায় জীবনকে l 

তিনি ছিলেন এবং আছেন সবখানে: আমার 'মা' -- জাকিয়া জেসমিন যূথী

সব যুগেই কোন একটি বিশেষ ব্যক্তি কারো না কারো প্রতি প্রভাব ফেলে। অন্তত বেশিরভাগ মানুষ কোন ব্যক্তিকে অনুসরণ করে। সেটি প্রত্যক্ষভাবে না হলেও অনেক সময় আনমনেই ঘটে যায়।
.
আমার জীবনেও তেমন একজন ব্যক্তি আমার মা। তিনি যেমন বড় ফামিলির বড় সন্তান ছিলেন, তেমনি বৈবাহিক সূত্রেও যৌথ পারিবারিক আবহেই জীবনযাপন করেছেন। আমিও সেই ছোটবেলায় কৈশোর পর্যন্ত নানাবাড়িতে বেড়ে উঠেছি। সেই সূত্রে একটি বিশাল পারিবড়িক আবহেই আমারও জীবনের কিছুটা সময় অতিবাহিত হয়েছে। এভাবে যৌ আবহে বিভিন্ন রকম মানুষের বিভিন্ন রকম মানসিকতায় টিকে থাকার একটা বোধ গেঁথে গিয়েছে খুব ছোটবেলাতেই। 
.
আম্মু খুব ভালো রাধুনী। খেতে ও খাওয়াতে খুব পছন্দ করেন। আমার মধ্যেও সেই বোধ রয়েছে। এসব বিষয়গুলো অবচেতন মনে পবিকল ভাবমূর্তি পেয়েছে নাকি তাকে দেখে আমার তাঁর মত হবার ইচ্ছে জেগেছে তা সেভাবে স্পষ্ট হয়না। কিন্তু এখন বর্তমানে এসে ভাবলে মনে হয়, এটাই আমার আদর্শ হয়ে গেছে। 
.
মা গরীব দু:খী দু:স্থের সেবা করেন। সেটিও আমার মধ্যে আসে। অসহায়ের কষ্ট দেখে নিজেকে ঠিক রাখতে কষ্ট হয়। নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে হলেও অন্যের জন্য নিবেদিত হতে ইচ্ছে করে। আজ তাই আমি নিজেই অনেক মানবিকতার সাথে জড়িয়ে যাই, জড়িয়ে আছি।এবং এই আদর্শ মায়ের কাছ থেকেই পাওয়া।
.
মানুষের জন্ম বড় বিষয় নয়। মানুষকে শ্রদ্ধা ও ভালবাসতেও মায়ের কাছেই শেখা। এখনো এত বড় হয়েও উচ্চ কণ্ঠের কথা তিনি বরদাস্ত করেন না। 
.
আমার বেড়ে ওঠার পরিমন্ডল থেকে এতটা এগিয়ে শিক্ষা দীক্ষা সৃজনশীলতায় পারদর্শী এই বর্তমান আমির পেছনে সর্বদা যার অদৃশ্য অথবা দৃশ্যমান সেবা ছিলো তিনি আমার মা। তিনি আছেনামার সমস্ত সাফল্য গাঁথার পেছনে। 
ভালবাসি আমার এই আদর্শকে, আমার এই অনুপ্রেরণাদাত্রীকে। 

আমার আইডল -- সিলভিয়া ঘোষ

প্রত্যেক মানুষের জীবনে একজন আদর্শ ব্যক্তি থেকেই থাকেন।এই বছর দশেক আগে আমার ছোট ছেলেকে জিজ্ঞাসা করা হতো ---'বড় হয়ে তুই কি হবি'? উত্তরে সে বলতো ---'বড়ো হলে আমি মামমাম(ঠাকুমা) হবো'।তার মানে ওর কাছে ওর ঠাকুমাই আদর্শ ব্যক্তি ।
সেই রকম আমার জীবনের আইডল একজন আছেন ----যাঁর কাছে এইটুকু শিক্ষা লাভ করেই আজ এখানে লেখালেখির সুযোগ পাচ্ছি।যাঁর সঙ্গে যোগাযোগের যে সূত্রটা ছিল সেই সূত্রটাকেও আমার জন্মের সাত/আট বছর আগেই হারিয়ে ফেলেছিলাম আমরা ।তবুও সম্পর্কটা এতোটাই গভীর ছিল যে মানুষটা আমার এবং আমার পরিবারের উপর বটগাছের মতোন ছিলেন।
তিনি ছিলেন আমার শিক্ষাগুরু তথা জীবনের গাইড-----আমার পিসেমশাই শ্রী কালিপদ চক্রবর্তী ।ছিলেন হিন্দু স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক ।আমার জীবনের কঠিন যে কোন পরিস্থিতি তে তাঁর কথা মেনে চলার চেষ্টা করেছি পদে পদে।
তাঁর মতে 'জীবনে সব সময় নীচের দিকের লোকজনের দিকে তাকাবে ,তাহলে দেখবে তুমি অনেক ভালো আছো ,তোমার থেকেও অনেক কষ্টে অনেকেই আছে ।'
'হিংসা করবে ---তবে তা খাবারের উপর নয়, পোশাকের উপর নয় ! পড়াশোনার বা বিদ্যার উপরে করবে হিংসা'।মানে তোমার থেকে ভালো যারা তাদের থেকেও ভালত করতে হবে।
তিনি বলতেন 'ভারতবর্ষ স্বামীজি কে চিনলো না',সাম্যের খোঁজে ছুটলো সেই রাশিয়া,চীন !! স্বামী জিকে পড়ো তবে সাম্য আসতে বাধ্য।'
আর বলতেন ----'সকল 'ম' (আমি,আমার ,অহমিকা) কে যদি জীবনে বাদ দিতে না পারো তবে জীবনে মুক্তি নেই। জীবনের সব মিথ্যা মানে ----মৃত্যু ই সত্য জগৎ মিথ্যা।অর্থাত্ সবই পড়ে থাকবে জীবনে '।
এই নমস্য মানুষটি যিনি আমার সন্তান ছিলেন আর আমি ছিলেম ওঁনার মা, তিনিই আমার জীবনে আইডল।

আমি এবং এক আশ্চর্য্য জ্যোৎস্না --- বাগু বিশ্বাস

তোমরা হয়ত দেখছ আমি যীশুর মত ক্রুশবিদ্ধ.....যাতনার বিষে নীলকণ্ঠ কোনো প্রতারক !
কিন্তু জানো কি..!! 
আমিই আমার আরাধ্য দেবতা, আমিই আমার ত্রাতা, হৃদয় বিধাতা।
অবলোকন বোধ, নান্দনিক সংবেদন এবং অসাধারণ ঋজুতায় পৃথিবীতে আমি একা...আমি ঈশ্বর।
আমি ইনকা থেকে হরপ্পা সকল সভ্যতার আলোক স্তম্ভ...আমি মরু ও মহামারীতে জাগিয়ে তুলি রজনীগন্ধা বন।
পাষাণ প্রান্তরে বইয়ে দিই ঝর্ণা প্রবাহ ।
আমার কণ্ঠে শবযাত্রার প্রার্থনাসঙ্গীত হয়ে ওঠে পৃথিবীর সবচেয়ে মধুরতম গীতি আলেখ্য।
আমি আমার আত্মাকে সৃজিত করেছি মহাসত্যের ভাষ্যে, নতুন বোধের আলোকে।
শরীরী রূপ অস্বীকার করে আমি আবিষ্কার করেছি গভীর অামিত্বের গোপন রহস্য।
এখন আমিই আমার নিয়তি, আমিই আমার নেমেসিস....আমিই আমার পুজ্য, আমিই আমার সংহারক।
নশ্বর এ জীবন বহন করে হয়ে যাবো পরাবাস্তবের অধিবাসী ।
অবাক মুগ্ধতায় তোমরা দেখে যাও...কাফনের মত জ্যোৎস্নার ভিতর দিয়ে ক্রুশবিদ্ধ এক করুন সুন্দর !
স্বাপ্নিক অসুখে আক্রান্ত এক বিয়োগান্তক চিত্রনাট্যের শেষ দৃশ্য !!

অক্ষর লিপি -- দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

বাতাসে জন্ম জন্ম গন্ধ । অন্ধকারে
গুহা গুহা । হাসি হাসি মুখে শঙ্খ ধ্বনি
আলো ঘোমটা খুলে
নাম । তারকব্রহ্ম । খোলে করতালে
হেঁটে যাচ্ছে সারাপাড়াময় । ভাদ্র সন্ধ্যা বাঁশি নিয়েছে ভিজে ঠোঁটে
টের পাচ্ছি । ছিলামগুলো আছি । ছিদ্রগুলো মেরামত । মতগুলো এক জায়গায় আর নিজের ভিতরে সাগর
রত্ন । ডুব দিলেই মেলে । মেলার ভীড়েও চিনে নিলে চিন্তা নেই । ঈর্ষা ভেঙে চোখ ঠিক খুঁজে নেয় বন্ধুর মুখ
মুখরতা থেমে গেলে রাত্রি কৃষ্ণ আরাধিকা রাধাকেইপায় আলোঅন্ধকারের জোড়ে

শুক্রবার, ১ জুলাই, ২০১৬

আমার জীবনে প্রিয় মানুষ ~ শ্যামশ্রী চাকী

বেড়ার ফাঁকে ভোরের অনুপ্রবেশকারী আলোয় আমার মায়ের মুখটা পদ্মপাপড়ির মত টলটল করত।
তখন স্বপ্নঘোর ঠিক কাটেনা
একটা কোমল পদ্মরাগ স্পর্শ সারাদিনের অক্সিজেনবাহী হয়ে কপালে হাত বুলিয়ে যায়।

রান্নাঘরে হলুদ মাখা হাতে অংক শেখাতেন মা। ডালের সম্বার আর পাটিগণিত মিলেমিশে এক হয়ে যেত সূর্য ওঠা নারকেল পাতায়। হ্যারিকেনের মুমুর্ষ আলোয় যখন টিনের চালে একঘেয়ে বৃষ্টির অর্কেস্ট্রা, আমাকে মেঘদূত পড়ে শোনাতেন মা।মায়ের সাথে গলা মেলাতাম 'কশ্চিৎকান্তা বিরহ গুরুনা স্বাধিকার প্রমত্তহ'..
যক্ষের বিলাপ, খিচুড়ির গন্ধ, সোঁদা মাটির আঘ্রাণ সমস্ত কিছু মায়ের মধ্যে মিলেমিশে মা কে এক আশ্চর্য রহস্যময়ী নারী করে তুলতো।

রবিবারের বিকেল মানেই এক অদৃশ্য জাদুকরের জাদুছড়ির স্পর্শে আমাদের উঠোন বদলে কবিতাবাসর। আমি কবিতা পড়ছি এক অলৌকিক খুশিতে ঝলমল করে উঠছে মায়ের চোখমুখ। সমস্ত পাড়াটার ওপড় যেন মায়ামাখা এক চাদর বিছিয়ে রেখেছে কেউ! সেখানে অপ্রাপ্তির হাহাকার নেই, ব্যার্থতার চোখ রাঙানি নেই, প্রত্যাশার তাড়া নেই।শুধু শান্তি.. অসীম শান্তি।
কারো সাথে এযাবৎ ঝগড়া না হওয়ার মূল মন্ত্রটা মায়ের শেখানো। জানি এমন হলে মা কষ্ট পাবেন।

আসলে আমি এখনো মায়ের রূপকথার সেই রাজকন্যা।তবে সেই আদরের দুলালি আজ নীলকণ্ঠী, তাই সব অপমান,আঘাত, সহানুভূতির আড়ালে লুকোনো ক্লেদাক্ত আঁচড় গিলে অনায়াসেই বলতে পারি; তোমরা ভাল থেকো।

আজকাল মায়ের উত্তরাধিকার সুত্রে পাওয়া 'সর্বংসহা' হওয়ার চাবিকাঠিটা মাঝে মাঝে মনের ভুলে আমার রূপকথার চোরাগলিতে কোথায় হারিয়ে ফেলি আর খুঁজে পাইনা।
আমার সহজ সরল আদি অকৃত্রিম মা এখন এই ক্ষয়াটে সমাজে মাঝে মাঝে চমকে ওঠে।সমাজের প্রত্যেকটি ধাপে নিত্যদিন ঘটে যাওয়া জটিল মনস্তাত্ত্বিক ট্র‍্যান্সফরমেশন দেখে ঘোলাটে চোখ মেলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।ইগো আর অহংকার, হিংসা আর হীনতা, লোভ আর উচ্চাকাঙ্ক্ষা ভরা নতুন প্রজাতি কে মা বুঝতে পারেন না, কিংবা বুঝতে কষ্ট হয়।
হয়ত বোকা বোকা শোনাবে তাও বলছি এই ইগো হীন, অহংকারশূন্য, ছাপোষা বেঁচে থাকায় মা
কে নিয়ে আমি খুব ভাল আছি।

সম্পাদিকার ডেস্ক থেকে

উৎসবের আলোড়ন কিছুটা স্তিমিত , তবুও মনের অলিন্দে হৈমন্তী স্বপ্ন । বারো মাসের তেরো পার্বণ প্রায় শেষ মুখে , উৎসব তিথি এখন অন্তিম লগ্ন যাপনে ব...