চিঠি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
চিঠি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

চুনি কোটাল: প্রথম মহিলা লোধা গ্র্যাজুয়েট - সুধাংশু চক্রবর্ত্তী

স্নেহের সুতপা , 

তোমাকে জানাই আমার প্রিয় নারীটির কথা । সে হলো ভারতের প্রথম মেয়ে লোধা গ্র্যাজুয়েট ‘চুনি কোটাল’ । কেন উচ্চশিক্ষিত হতে চেয়েছে শুধুমাত্র এই অপরাধে অত্যন্ত মেধাবী এবং পরিশ্রমী এই লোধা মেয়েটিকে আত্মহত্যা করতে হয়েছে । জন্ম ১৯৬৫ সালে, হতদরিদ্র পরিবারে । পাঁচ বছর বয়সে ছেঁড়া জামা গায়ে দিয়ে ভর্তি হয়েছিলো গ্রামের পাঠশালায় । একে লোধা, তায় মেয়ে ! পাঠশালার গুরুমশায়ের বিরক্তি । সামান্য ভুল করলেই বেত পড়তো পিঠে । চুনি তখনই জেনেছিলো তাকে প্রতিবাদ করতে হবে পড়াশোনা করে দেখিয়ে । সেই জেদেই একটার পর একটা ধাপ পেরিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলো জুনিয়ার হাইস্কুলে ।

কাগজের অভাবে ক্লাসে অঙ্ক কষে দেখাতে না পারার অপরাধে বেঞ্চে দাঁড়াতে হলেও ক্লাসে সবসময় দ্বিতীয় হতো । যত পীড়ন করা হতো তার জেদ ততই বেড়ে যেতো । মাধ্যমিক পরীক্ষায় মাত্র সাত নম্বরের জন্য বঞ্ছিত হয় দ্বিতীয় বিভাগ থেকে । ১৯৮০ সালে ভর্তি হয় মেদিনীপুর কলেজে একাদশ শ্রেণীতে কলা বিভাগে । উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে ভর্তি হয় স্নাতক শ্রেণিতে অর্থনীতি নিয়ে । ১৯৮৫ সালের জানুয়ারি মাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পরীক্ষার ফল বেরোল । চুনি হলো ভারতের প্রথম মহিলা লোধা গ্র্যাজুয়েট । 

এরপর ভর্তি হয় মেদিনীপুরে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃতত্ত্ববিদ্যা ও আদিবাসী সংস্কৃতি বিভাগে । বিশ্ববিদ্যালয় এবং ছাত্রীনিবাসের জাঁতাকলে পড়ে চুনি ক্লাস করে কিন্তু পার্সেন্টেজ পায় না । পরীক্ষা দেয়, পাশ করে না । ওদিকে আদিবাসী ছাত্রী নিবাসেও চুনির ওপর চলে অকথ্য মানসিক নির্যাতন । তার নামে নানা অপবাদ রটতে থাকে । বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্যক্ষভাবে তাকে গালাগালি করে বলা হয় – লোধার মেয়ে, চোরের মেয়ে তার আবার এম. এ. পড়ার সাধ ! চুনি প্রতিবাদ করলে তার প্রতি দুর্ব্যবহার আরও বাড়ে, তাঁর জীবন অতিষ্ঠ করে তোলা হয় ।

১৯৯০ সালে মন্মথ শবরকে রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করে । এম এ পার্টট ওয়ানে মাত্র ৭ নম্বরের জন্যে প্রথম শ্রেণি পায়নি । ফাইনাল পরীক্ষায় সেই ঘাটতি মেটানোর জন্যে ১৯৯২ সালের ১০ আগস্ট ছাত্রীনিবাস থেকে ছুটি নিয়ে চলে আসে খড়্গপুরে স্বামীর কাছে । সকলের দুর্ব্যবহার আর সইতে না পেরে সেইসময়ে একদিন গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে পড়ে সে । সুইসাইড নোটে সকলকে ক্ষমা করে যায় । এই লড়াকু লোধা মেয়েটিকে জানাই অসীম শ্রদ্ধা । 

ইতি, 
তোমার কাকা সুধাংশু চক্রবর্ত্তী
১২ আগস্ট, ২০১৭ 
চৌধুরীপাড়া ; হালিশহর

রবিবার, ২ জুলাই, ২০১৭

অস্তিত্ব __ শর্মিষ্ঠা দত্ত


স্নেহের বাবাই , 

সামনে বিছানো আছে অন্তহীন পথ ...সেখানেই আমার গন্তব্যে এসে পৌঁছেছি আজ l আমাকে খুঁজিস না আর ...হয়ত খুঁজবিও না ...স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবি অবশেষে ...
ও বাড়িতে তোদের নিত্যদিনের অশান্তি দেখতে দেখতে প্রতিদিন মৃত্যুকে ডাকতাম আমি ; আরো বেটার লাইফস্টাইলের জন্য কখনো কখনো এক্সট্রা ডিউটি করে প্রায় মধ্যরাতে বেসামাল অবস্থায় সোনালী বাড়ি ফিরত ; হিংস্র পশুর মত তোরা ঝাঁপিয়ে পড়তিস পরস্পরের দিকে ... নিজেকে বলতাম , আর কত ? ...আরো কতদিন এই অপ্রাসঙ্গিক , অপ্রয়োজনীয় অস্তিত্বটা দিয়ে নিজের সন্তানের জীবনের ধ্বংসের সাক্ষী হয়ে থাকব ?
বেসামাল সোনালী যখন চোখে একরাশ ঘৃণা উগরে রিসেশনের কারণে তোর থমকে থাকা কেরিয়ারকে , তোর অকর্মণ্যতাকে তোদের আর্থিক অসচ্ছলতার জন্য দায়ী করত ... ওর জীবনের জটিলতার জন্য প্রত্যক্ষ্যভাবেই আমাকে দোষারোপ করত ... আমার অভিভাবকত্বের ত্রুটির কথা বলত ; তোদের সংসারে বাড়তি মেদ বলে চিহ্নিত করত আমায় ...তখন তুইও সস্তা মদের বোতল থেকে গলায় ঢেলে নিতিস ফ্রাস্ট্রেশনের বিষ ...আমার সামনেই ...আমি সহ্য করতে পারতাম না ; তোর হাত থেকে কেড়ে ফেলে দিতে যেতাম বোতলটা ...আর তোর সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ত আমার ওপর l আমার হাতে ,পিঠে এখনও সেই কালশিটের দাগ ...তবু সর্বংসহা মা হয়ে বরাবর ক্ষমা করে গিয়েছি তোকে ...আমার অস্তিত্বটাকে তখন বড় অবান্তর মনে হত রে বাবাই ... আমি মরমে মরে যেতাম l
রাতের অশান্তির জেরে সকালে সোনালী বেঘোরে ঘুমোয় ...উঠতে অনেকটা দেরি হয় ; উঠেই আবার অফিস বেরোনোর তাড়া থাকে ওর ...তাই রান্নাঘরের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাইনি কোনদিনই l সকালের চা-এর কাপটা এগিয়ে দেওয়ার সময় দেখতাম তুই আর আমার মুখের দিকে তাকাতে পারছিস না ... চা খেয়েই বেরিয়ে যেতিস ...তারপর সারাদিন কোথায় কোথায় ঘুরতিস উদ্দেশ্যহীন...যতক্ষণ না ফিরতিস দুশ্চিন্তায় দুচোখের পাতা এক করতে পারতাম না l সন্ধ্যেবেলা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ফেরার পর আবার সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি...যেন একটা গোলকধাঁধায় আটকে পড়া জীবন !
আজ সন্দীপনদা এসেছিলেন...তোর প্রিয় সেই দীপনকাকু ; তোর বাবার বাল্যবন্ধু ; যাঁর কোলেপিঠে চড়ে মানুষ হয়েছিস তুই l সারাটা জীবন যিনি দ্বিধাহীনভাবে পাশে থেকেছেন আমাদের l মনে আছে ... তোর বিয়ের পর সোনালী একদিন প্রশ্ন তুলেছিল...তোর মৃত বাবার ব্যাচেলর বন্ধু কেন এখনও আমাদের বাড়ি আসেন ! ...আমি সন্দীপনদাকে একথা না বললেও হয়ত তিনি সোনালীর চোখের ভাষা পড়তে পেরেছিলেন ...তাই দীর্ঘ দুটো বছর পা রাখেননি এ বাড়িতে l
যোগাযোগ না থাকলেও সন্দীপনদা যে নিয়মিত আমাদের খোঁজখবর রেখেছেন সেটা আজ বুঝলাম l গত সপ্তাহে তোদের তুমুল অশান্তির জেরে প্রতিবেশীরা জড় হয়েছিল বাড়ির বাইরে ; আর আমি নিজের ঘরে বসে ঠকঠক করে কাঁপছিলাম l পরেরদিন সকালেই ফোন করেছিলেন সন্দীপনদা...জিজ্ঞেস করেছিলেন আমি আবার নতুনভাবে জীবনটা শুরু করতে চাই কি না ! আমি হেসে উঠেছিলাম ..." এই পঞ্চাশ বছর বয়েসে নতুন জীবন ! ...আমার অস্তিত্বটা নিয়ে তামাশা করছেন সন্দীপনদা ! "
সন্দীপনদা অকৃতদার হলেও তাঁর সংসারটা নেহাত ছোট নয় l অনেকদিন ধরেই জড়িয়ে আছেন বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে ... এর আগে ভাসা ভাসা শুনেছিলাম একটা অনাথ আশ্রম আছে ওঁদের l বললেন , গত বছর ব্যাংকের চাকরিটা থেকে অবসর নেওয়ার পর থেকে এখন ওঁর সম্পূর্ণ সময়টা কাটে ওখানেই l
বারোজন শিশু-কিশোরের মা হয়ে ওঠার আবেদন রেখেছেন উনি আমার কাছে l তোদের সংসারে আমার প্রয়োজন ফুরালেও , ওদের আজ একজন মায়ের খুব প্রয়োজন l এভাবে প্রতিদিন মরে যেতে যেতে আজ একবার খুব বেঁচে ওঠার ইচ্ছে হলো রে বাবাই ! ...এই প্রথম নিজের অস্তিত্বটা যে নিরর্থক নয় সেটা অনুভব করলাম l ... মনের গোপন ঘরে প্রতিদিন যে মাতৃত্ববোধ একটু একটু করে মরে যাচ্ছিল সেটাই আবার নতুন করে আঁকড়ে ধরতে চাইল আমার সন্তানদের ....হ্যাঁ ; বায়োলজিক্যালি তুই আমার একমাত্র সন্তান ....কিণ্তু আমার মাতৃত্ব যে আজ আর গন্ডীবদ্ধ নয় ; আজ বিকেলে এখানে পৌঁছানোর পর থেকেই এটা অনুভব করছি আমি ...
আমার ছেলেমেয়েদের নিয়ে খুব আনন্দে সময় কাটছে আমার ...ওদের আবদার , কারণে -অকারণে "মা" বলে ডেকে ওঠা ...তোর ছোট্টবেলাটাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে আমায় l ভাল আছি আমি ...খুব ভাল থাকব এখানে ...ওদের মা হয়ে নিজের জীবনের একটা উদ্দেশ্য খুঁজে পেলাম আজ l
নিজের কেরিয়ারের থেকে তোকে প্রাধান্য দিয়েছিলাম তাই উপার্জন করিনি কোনদিনই l আমার যতটুকু সঞ্চয় ; সবই তোর বাবার দান ... রেখে গেলাম তোদের জন্যই l ও টাকায় আর কোনো প্রয়োজন নেই আমার l অবাঞ্ছিত অস্তিত্বটা নিয়ে চলে গেলাম ; এবার অন্তত নিজেদের মধ্যে শত্রুতা ভুলে আপোস করে নিস দুজনে ...একটা শান্তির সংসার গড়ে তুলিস ...তোদের অনাগত সন্তান যেন একজন মানবিক মানুষ হয়ে ওঠে l

..................সতত শুভাকাঙ্খী মা

শনিবার, ২২ এপ্রিল, ২০১৭

রবীন্দ্রনাথের তিন নায়িকা ----- রীনা রায়

প্রিয় সংযুক্তা, 

সেদিন তোর সাথে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের নায়িকাদের আলোচনা প্রসঙ্গে বেশ কিছু জনের কথা বলা হলেও বাড়ি ফিরে মনে হল, আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ না করলেই নয়।
প্রথমেই আমি 'ঘরে-বাইরে ' উপন্যাসের নায়িকা বিমলার কথা বলতে চাই। বিমলার সাথে কিন্তু আমি এযুগের মেয়েরও দিব্যি মিল পাই।
এখানে নায়িকা অপরূপা সুন্দরী নয়, শ্যামলা, ঢ্যাঙা এক মেয়ে, যার বিয়ে হয় এক উচ্চবিত্ত পরিবারে, তাকে পছন্দের একমাত্র কারণ সে সুলক্ষণা ।
বিমলা নিখিলেশকে স্বামী হিসেবে পেয়ে যেন বর্তে গেছিল, কিন্তু তার প্রতি স্বামীর অতিমাত্রায় যত্ন, ভালবাসা, মনোযোগ, কর্তব্যে সে যখন অভ্যস্থ হয়ে উঠলো, তখন বিমলা সেগুলো তার প্রাপ্য ভেবে স্বামীর প্রতি কিছুটা উদাসীন হয়ে পড়েছিল। 
তুই দেখবি, যা আমরা না চাইতেই পেয়ে যাই, তার কদর করিনা।
এইসময় সন্দীপ তার জীবনে যখন এলো, সন্দীপের রূপ, বক্তৃতা, সহজভাবে মিশতে পারা তাকে প্লবল আকর্ষণ করলো, কিন্তু ছল সন্দীপের মুখোশটা যখন তার সামনে খুলে গেল, সে বুঝতে পারলো, কি ভুল সে করতে যাচ্ছিল ।
আজকের দিনেও এমন নারী অসংখ্য, যারা সুখী নই, স্বাধীনতা নেই বলে বাইরের কোনো ছল পুরুষের আকর্ষণে ছুটে যায় । তারপর ভুল বুঝতে পেরে তারা আবার ফিরতে চায়, কিন্তু সবার তো নিখিলেশের মত স্বামী হয়না--
দ্যাখ, এমনিতে কিন্তু বিমলা ভাল মেয়ে । সে অমূল্যকে ভাই ডেকেছিল বলে অমূল্যর বিপদের কথা ভেবে তার প্রাণ কাঁদে, যে মেজজাকে সে ঘোরতর অপছন্দ করতো, শেষমেশ সেই মেজজাকেই সে আশ্রয় করে।
এমন বিমলা আমাদের চারপাশে অনেক আছে রে।
সব মিলিয়ে বিমলা চরিত্রটি আমাদের মনে থেকে যায় ।
আবার 'চোখের বালি'র বিনোদিনীরকে দ্যাখ--এখানে বিনোদিনী শিক্ষিতা এবং সুন্দরী। তবু ভাগ্যের কি পরিহাস, 
যার সাথে তার বিয়ের কথা ছিল, সে তাকে বিয়ে করতে না চাওয়ায় অন্য জায়গায় তার বিয়ে হল এবং সে বিধবা হল। এরপর বিধবা বিনোদিনী ঘটনাচক্রে সেই বাড়িতে এসে দেখলো, সেই মহেন্দ্র একটি নিরক্ষর বালিকাকে বিয়ে করে পরম সুখে দিনযাপন করছে।
এই মহেন্দ্র তাকে বিয়ে করতে চায়নি।
মহেন্দ্রর বৈভব, মহেন্দ্রর বিবাহিত জীবনের সুখ ওকে কাঁটার মত বিঁধছিল।
এসব তো তার হতে পারতো, সে মহেন্দ্রকে জিতে নিতে চাইলো। মহেন্দ্রর সাথে ভালবাসার খেলা খেলতে খেলতে মহেন্দ্রর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ল।
এই খেলায় সে নিজেকেই আরও কলঙ্কিনী করে তুললো।মহেন্দ্র যখন তার বশীভূত হয়ে সংসার ছাড়লো, তখন সে বুঝলো, সে আসলে মহেন্দ্র নয়, মহেন্দ্রর বাল্যবন্ধু বিহারীকে ভালবাসে, যে বিহারী একদিন তাকে আঘাত করেছিল, অপমান করেছিল, সেই বিহারীকেই ও মন থেকে ভালবেসেছে।
কিন্তু বিহারীকে যখন সে মনের কথা জানালো, বিহারী তাকে বিয়ে করতে চাইলে সে রাজী হয়না।
দেখবি তুই, যা আমাদের নাগালের বাইরে তার প্রতি আমাদের প্রবল আকর্ষণ থাকে, আর তা যখন আমাদের হাতের মুঠোয় চলে আসে তখন আর আকর্ষণ থাকেনা।
তারপর দ্যাখ আর এক নায়িকা 'শেষের কবিতা'র লাবণ্য ।
তার বিদ্যা, তার জ্ঞানই যেন তার রূপকে পরিনতি দিয়েছে।
লাবণ্য জানতো অমিত ওকে ভালবাসে, সে নিজেও অমিতকে গভীরভাবে ভালবেসেছিল ।
কিন্তু প্রথমদিকে বিয়েতে তার মত ছিলনা।
লাবণ্যর মতে, ভালবাসার ট্রাজেডি ঘটে সেইখানে, যেখানে পরস্পরকে স্বতন্ত্র জেনে মানুষ সন্তুষ্ট থাকতে পারেনা, নিজের ইচ্ছেকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে ভাবি তাকে নিজের মতো বদলে নেবো।
লাবণ্যর মতে, খুঁতখুঁতে মন যাদের তারা মানুষকে খানিক খানিক বাদ দিয়ে বেছে বেছে নেয়, কিন্তু বিয়ের পর তারা বড় বেশী কাছাকাছি এসে পড়ে, সেখানে আড়াল কিছু থাকেনা।
তাই লাবণ্য যখন অমিত আর কেটির পূর্ব প্রণয়কাহিনী জানতে পারলো, নিজেকে সে সরিয়ে নিলো।
তারা দুটি মানুষ পরস্পরকে সত্যি ভালবেসেও এক হতে পারলোনা।
ভালবাসা থেকে গেল তাদের অন্তরে অমর, অমলিন হয়ে ।
"যে ভালবাসা ব্যাপ্তভাবে আকাশে মুক্ত থাকে, অন্তরের মধ্যে সে দেয় সঙ্গ"
---
আজ এই পর্যন্তই থাক রে, বাকীদের নিয়ে না হয় আর একদিন আলোচনা করা যাবে।
ভাল থাকিস।


ভালবাসাসহ, 
তোর মিতিল

বৃহস্পতিবার, ৩০ মার্চ, ২০১৭

অভাগিনীর পত্র --- রীনা রায়

শ্রীচরণেষু বাবা,
 
এই প্রথম তোমাকে চিঠি লিখছি, জানিনা মেয়ের লেখা বলে এ চিঠি তুমি আদৌ পড়বে কিনা। জানি, অবাক হচ্ছো, ভাবছো কেনই বা আমি তোমাকে চিঠি লিখলাম। আসলে, 
চলে যাবার আগে তোমাকে মনের কষ্টটা বলে যেতে বড় সাধ হল ।
বাবা, জানি আমার জন্ম তোমার বা ঠাকুমার কাছে এতটুকু আনন্দের ছিলনা।
আমার জন্মের সময় কেউ একটাও শাঁখ বাজায়নি, শুনেছি তুমি বা ঠাকুমা বহুদিন আমার মুখও দেখতে চাওনি। তোমরা ছেলে চেয়েছিলে, তোমাদের বংশধর চেয়েছিলে, তাই ভাই যখন জন্মাল তোমাদের আনন্দ দেখে মনে হত মায়ের কোলে যেন কোনো মহাপুরুষ 'অবতীর্ণ' হয়েছে! 
ভাই নাকি তোমাদের সমস্ত 'অপকর্ষ ' থেকে উদ্ধার করবে! 
বাবা, ঠাকুমা না হয় সেকেলে মানুষ কিন্তু তুমি তো এইযুগ সম্পর্কে 'অজ্ঞ' নও, তুমি তো জানো, এ'যুগে মেয়েরা পারেনা এমন কোন কাজ নেই, তবুও কন্যাসন্তানের প্রতি এত অবহেলা কেন? 
আমি দেখতাম, ভাই কিছু চাওয়ার আগেই সেই জিনিসটা পেয়ে যেত, আর আমার দৈনন্দিন জীবনের অত্যাবশ্যক জিনিসগুলোও তোমার কাছে 'অনাবশ্যিক' বলে মনে হত--
ভাইয়ের শত অপরাধেও তোমরা ওকে শাসন করা থেকে 'বিরত' থেকেছো।
আমি অবাক হয়ে দেখতাম, কোন কিছুর প্রতি আমার 'অনুরাগ' জন্মালেই তুমি প্রাণপণ চেষ্টা করতে সেটা থেকে আমাকে দূরে সরিয়ে দিতে ----
আমি আর পারছিনা বাবা, দিনের পর দিন তোমাদের কাছ থেকে এত অবহেলা পেতে পেতে মনের অবচেতনে নিজের প্রতিই একটা ঘৃণা জন্মেছে, তাই 'ঐহিক' সমস্ত যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে আমি অত্যন্ত 'সচেতন'ভাবে আত্মহত্যার পথ বেছে নিলাম, সেই সঙ্গে তোমাদেরও মুক্তি দিয়ে গেলাম।
বাবা, আমি কিন্তু তোমাদের সবাইকে খুব ভালবাসি, তোমরা যদি আমাকে একটু কাছে টেনে নিতে---
আমার প্রণাম নিও ।


ইতি তোমার হতভাগী কন্যা 
হিমানী।

পাইকপাড়া, কোলকাতা

সোমবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

খোলা চিঠি ---- সুদীপ্তা নাথ

তোমায় ক্ষমা করেছি বাবা।কারণ না করার আর কোনো কারণ নেই! যে মানুষটা সারা দেহে রোগ,ব্যাধি আর কোষে কোষে তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে চলে গেছে হঠাৎ,তাকে আর যাই হোক অন্তত ঘৃণা করার আর কিছু থাকেনা।
আমার জীবনের ২৭টা বছর আমি যুদ্ধের প্রস্তুতি তে কাটিয়েছি।ভেবেছি ফের যখন মোলাকাত হবে তখন যেন যোগ্য জবাব একে একে ফিরিয়ে দিতে পারি।তাই মনে মনে যুদ্ধক্ষেত্র রচনা করে একে একে ঢাল,তরবারি সাজিয়েছি আর আগুনে ঘৃতাহুতির মতো আরো আরো ঘৃণা জমিয়েছিলাম।বুকের ভেতর অনেক আগুন পুষে এভাবেই চলছিলো বেশ তারপর হঠাৎ একদিন কর্মস্থল থেকে ফিরে শুনলাম - "তুমি আর নেই।বাথরুমে স্ট্রোক হয়ে নাকি পড়ে গিয়েছিলে।তারপর আর ওঠোনি।"
না আমি কাঁদিনি।কারণ বাবার জন্যও যে কান্না আসে তা তো কখনো জানতামই না।তবে সেদিন অদ্ভুত কিছু একটা হয়েছিলো ভিতরে।অজানা একটা রাগ হয়েছিলো খুব! কেন এমন হবে! আমার এতোকালের সাজানো যুদ্ধক্ষেত্র, আর এতো দিনকার যুদ্ধের প্রস্তুতি! তার কি হবে!? কেন এভাবে ঘেটে দেওয়া হল আমার সাজানো পরিকল্পনা!? এভাবে হঠাৎ জীবন থেকে quit করে যুদ্ধ বানচালের মানে কি!? এটা তো জিতে যাওয়া এক প্রকার! এ যুদ্ধ টা তো আমার জেতার কথা ছিলো। কিন্তু সে সুযোগও তুমি কেড়ে নিলে এইভাবে !?
তুমি চলে গেছো আজ এক বছর হল।ঘটনার আকস্মিকতায় সময়ের প্রলেপ পড়েছে যত বুঝেছি- আসলে কিছু যুদ্ধের মীমাংসা হয় না।ক্ষমাই তার একমাত্র যোগ্য জবাব।আমি তোমায় ভালোবাসতে পারিনি হয়তো কিন্তু তোমার প্রতি আমার আর কোনো ক্ষোভ নেই।দীর্ঘ না পাওয়ার ফর্দ দিয়ে তোমায় দায়ী করি না আর।কারণ সেগুলোই তো আমার এগিয়ে চলার আগুন হয়েছিলো।তোমার সাথে যুদ্ধ জিতবো বলে মরিয়া হয়ে জীবনসমুদ্রে সাঁতরাতে সাঁতরাতে বুঝতেই পারিনি কখন জীবনের আরো অনেকগুলো যুদ্ধে আসলে আমি জিতে যাচ্ছিলাম।
ভাগ্যিস তুমি এতোটা কষ্ট দিয়েছিলে। ভাগ্যিস তুমি একটুও ভালোবাসোনি।তাই তো এতোটা রাস্তা একাই পেরোতে পারলাম। তাই তো আসলেই জিতে গেছি।
আজ তুমি যেখানেই থাকো ভালো থেকো বাবা।

ইতি,
তোমার মেয়ে

নীল দিগন্তে ঐ ফুলের আগুন লাগলো ----- লীনা রায়চৌধুরী

আকাশ, 

আরো এক বসন্তের ছোঁয়া না ছোঁয়া!অনেকগুলো স্মৃতি -মেদুর দিন,ভালোলাগা -মন কেমন করা -অভিমান, আবার আষ্ঠে-পৃষ্ঠে রূপকথা হয়ে যাওয়া! 
মনে পড়ে আমরা যখন দুর্গাপুরের এ জোন থেকে বি জোন,হর্ষবর্ধন থেকে চণ্ডীদাস হেঁটে বেড়াতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা --মনে হত এযে অনুপম ঋতুর রঙ্গভূমি! তখন দুর্গাপুর অসংখ্য গাছে ঘেরা ছিল ।শীতের বাহু ছিন্ন করে বসন্তের ছোঁয়ায় যখন রিক্ত গাছগুলো কচি পাতায় ভরে উঠত।চারদিকে আম্রকুঞ্জ, জামের বাগানে, আরো কত নাম না জানা গাছ মুকুলে ভরে যেত।আমি তোমাকে মুকলের গন্ধ চেনাতাম।সমস্ত মুকলের গন্ধ -বিধুর রোমাঞ্চে -আবেশে আমরা ভরে যেতাম ।
আমরা ইচ্ছা করে ঝরা পাতার উপর উপর হেঁটে যেতাম ।অরণ্যের পত্র মর্মরে জাগত প্রলাপ মুখর রোমাঞ্চ।কখনও কখনো তুমি অভিভাবক সুলভ নিষেধের বেড়াজাল দিয়ে বলতে, "শীত চলে গেছে, শুকনো পাতার নীচে সাপ থাকতে পারে!"আমি চপল বালিকার মত তোমার নিষেধ মানতাম না।এখনো শুকনো পাতার উপর হাঁটতে ভালবাসি।বসন্ত!!!
চারদিকে শিমুল -পলাশে আগুন ঝরা লাল হয়ে উঠত।অশোক -শিমুল -কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম উচ্ছাসে আমরা ভেসে যেতাম।কদম গাছ ছিল আমাদের কোয়ার্টারের সামনে,আমি ওর নাম দিয়েছিলাম ঋতুরাজ -তোমার মনে আছে?
'তানসেনের 'রাস্তার পাশে নারকেল পাতায় ঘেরা একটা চায়ের দোকান ছিল ।তার দুপাশে ছিল সজনে গাছ।ফুলে ভরা দুটো গাছই দোকানের উপর ঝুঁকে পড়ত ।অদ্ভুত ছিল সারা বছরই গাছগুলো ফুলে ফলে ভরে থাকত।আর ছিল দোকানের সামনে একটা মাধবীলতা গাছ।কি ফুল!কি ফুল!ফুলের ভারে ,গন্ধের বন্যায় উথাল পাথাল ।দোকানের সামনে একটা অব্যবহৃত সিমেন্টের লাইট পোস্ট ।অলিখিত বসার স্থান ।আমরা চা খেতাম আমাদের রূপকথাদের সঙ্গে নিয়ে ।
দুর্গাপুরে খুব সুন্দর বসন্তোৎসব হত।নির্দিষ্ট দিনে লাল-হলুদ পোশাক পরে ছেলে মেয়েরা যেত নৃত্য করতে করতে-"নীল দিগন্তে ওই ফুলের আগুন লাগল।/বসন্তে সৌরভের শিখা জাগল।" কি অসাধারণ মুর্চ্ছনা ঐ গানে! আমার কানে এখনও বাজে।
তুমি নিশ্চয়ই ভুলে যাওনি পলাশ আমার ভালবাসা-আমার প্রিয়।সেই ছোট্ট পলাশ গাছটা এখনও আমার কাছে আছে ।পত্রে,শাখায় যৌবনোদ্দীপ্ত বসন্তের বিজয় পতাকা নিয়ে সাড়ম্বরে ।
আজ কেমন যেন স্মৃতি বিলাসে পেয়ে বসছে মন।সময়ের বিবর্তনে পাল্টে যাওয়া মন ..... । আজ ও ছোট স্মৃতি গুলোর অপূর্ব প্রকাশ -কে আঁকড়ে আগে ।


ধরিত্রী --

বৃহস্পতিবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০১৭

খোলা চিঠি ----- শুভা গাঙ্গুলী

শোনো অপূর্ব , 

আজ অনেক দিন পরে,তোমার শেষ চিঠির জবাব লিখতে বসেছি, সেই কবে, কতকাল আগে লেখা তোমার প্রেমপত্র আমি আজও সযত্নে তুলে রেখেছি, না ভুল করছো তুমি,ভালোবেসে নয়, আমার' প্রাক্তন' প্রেমিকের
'বসন্ত বিলাপ' আমার সন্তানদের শোনাবো বলে,যাতে তারা আমার মতো 'আকাশ কুসুম'
না রচনা করে।
তোমার সাথে প্রেমে আমার তরফ থেকে কোনো ঘাটতি
ছিলো না হয়তো তুমিও সেই বয়সে দাঁড়িয়ে আজকের মতো স্বার্থান্ধ ছিলে না,তুমি আমার সাথে ঘর বাঁধতে চেয়েছিলে, ঘর হয়েছিলো কিন্তু অসম্ভব পুরানোপন্থী তোমার গোঁড়া পরিবার আমাকে কোন স্বাধীনতা দেয় নি,আমাকে
'সোনার কেল্লা'য় বন্দী করে রাখা হয়েছিলো, আমার লেখার জগত থেকে আমাকে, তোমাদের 'শাখা প্রশাখা'য় বিস্তৃত বিশাল পরিবারে বন্দী রাখা হয়েছিলো।

সর্বদাই শুনতে এই মেয়ে 'অপুর সংসারে'র জন্য উপযুক্ত নয়, এ মেয়ে
ঘরে বাইরে নাম কিনতে চাওয়া মেয়ে।
তোমার সাথে সাতপাকে বাঁধা পড়ে,আমি 'অশনি সংকেত' কে অগ্রাহ্য করেছি, দিন দিন ক্রমবর্ধমান অশান্তিতে আমাকে নিভৃত 'অভিযান'
চালাতে হয়েছিলো, তোমার ভাই যে নানা পত্রিকায় লেখালেখি করে, আমাকে
আন্তরিক সাহায্য করেছিলো, তাই আজ আমি
একটা বিশিষ্ঠ পত্রিকার সম্পাদিকা পদে আসীন।
আমি তোমার ভাইয়ের কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবো।
আমাকে 'কোনি'র মত সেই দুঃসহ জীবনে ডুব সাঁতারে
পাড়ী দেবার রাস্তা দেখিয়েছিলো, আমাকে আমার পছন্দের রাস্তায় চলতে শিখিয়েছিলো,আর
তুমি নির্লিপ্ত হয়ে তোমার বাড়ীর মনোভাব দেখিয়েছো,
তারপর গঙ্গায় অনেক জল
বয়ে গেছে, আমাকে আবার বাঁচার পথ দেখিয়েছে অমিত, আমরা এখন একসাথেই থাকি,অমিতের
নিজস্ব লেখালেখির দুনিয়ায়
ব্যস্ত আর এখন এতদিন পর তুমি তোমার সন্তানের কাস্টডী চাইছো,যে অমিত কেই নিজের বাবা মনে করে,কেনো ওকে কনফিউসড কোরছো হঠাত এতদিন পরে।
তুমি এখনও নিজের ঘরসংসার সাজাতে পারো,
আমাদের দেশে দারিদ্রতা র দেশে মেয়েরা তো সব সময়ই সস্তা। বেলাশেষেও
তুমি ঘর বাঁধতে পারো।
তুমি আমার সন্তানের পিতা, কিন্তু সেদিন তুমি আমাকে যেদিন ওরা মিথ্যে বদনাম দিয়ে আমায় ঘরছাড়া করেছিলো,আমার সাথ দাও নি।
ভালো থেকো,


ইতি,
চারু (চারুলতা)

শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

তিক্ত অতীত -- রীনা রায়

হাই শুভ্র, 

সঙ্গীতার কাছে শুনলাম, তুমি নাকি জেলের ভাত ছেড়ে এখন বাড়ীর ভাত খাচ্ছো! এটা সম্ভব হল কি করে? খুব ভাল ভাল কাজ করেছো নাকি? আমার হিসেবমতো তোমার আরও তিনবছর জেলের ভাত খাওয়ার কথা----এই, তুমি আবার ভালো ছেলে হয়ে যাওনি তো! হা হা হা, ডোন্ট মাইন্ড হ্যাঁ।
পুরনো কথাগুলো ভাবলে এখন আমার হাসি ছাড়া আর কিছু আসেনা।
মনে পড়ে, আমার সব কাজেই তোমার প্রশংসায় 'পঞ্চমুখ হওয়া' দেখে আমার এক দিদি বলতো, ''দেখিস মিমি, 'অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ' হয় কিন্তু ''। তিনি তোমাকে ঠিক চিনেছিলেন ।
তোমাকে আমি যতই অবজ্ঞা করতাম না কেন, 'নাছোড়বান্দা ' তুমি কোনো কিছুই গায়ে মাখতে না। মিষ্টি মিষ্টি কথায় আমাকে ঠিক বশ করে নিতে । এখন বুঝি, আসলে তোমার 'উড়নচন্ডী' স্বভাব ঠিকমতো বজায় রাখার জন্য তোমার প্রয়োজন ছিল একটা টাকার সোর্স।
সবকিছুই তোমার প্ল্যানমাফিক চলতো, যদি না সেদিন সঙ্গীতা তোমাকে আমার সাথে দেখে ফেলতো। 
ওই তো তোমার বিবাহিতা স্ত্রীকে গিয়ে সব জানিয়েছিল, আর সে আমাদের বিয়ের আসরে এসে সবকিছু 'কেঁচে গন্ডুষ' করে দিয়েছিল। 
আর, 'অদৃষ্টের পরিহাসে' তোমাকে সেদিন জেলে যেতে হয়েছিল ।
যাক, এবার আশা করি নিজেকে শোধরাবে। 
নাহ্, তোমার প্রতি কোন আবেগ আর আমার অবশিষ্ট নেই ।


---ইতি মিমি

মঙ্গলবার, ৩০ আগস্ট, ২০১৬

লেখা-ছবি-আনন্দ -- পিয়ালী পাল

প্রিয় তুতান , 

ফেসবুকে তোর পোস্ট করা ডুয়ার্সের ছবিগুলো বেশ লাগলো। বিশেষ করে ওই ছবিটা যেখানে ধানক্ষেত আর চা বাগান পাশাপাশি, অদূরে পাহাড়। তোর এই সরল সুন্দর মন যেন এমন’ই থাকে ভাই, এটাই যে আসল আনন্দ। জানিস ভাই আমার কিসে সবথেকে আনন্দ হয়? কিছু লিখলে। মন থেকে সরাসরি টাইপ করি যখন, খুব শান্তি পাই। কবি জীবনানন্দ-এর কিছু কথা বারবার মনে পরে .......
“ আমি তারে পারি না এড়াতে
সে আমার হাত রাখে হাতে;
সব কাছ তুচ্ছ হয়, পণ্ড মনে হয়,
সব চিন্তা — প্রার্থনার সকল সময়
শূন্য মনে হয়,
শূন্য মনে হয়!”
নিঃস্বার্থ লেখার আনন্দই আমার কাছে সবচেয়ে দামি। অন্তত লেখার সময়টুকু তো আমি স্বাধীন। কেউ বলবে না “এটা করতে নেই ওটা করতে নেই”। লেখার আনন্দে লিখে যাই। সহিত্য-টাহিত্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে লিখি না। মন খুলে কথাগুলো বলতে পাড়ি, এই শ্রেয়। যাইহোক, ভালো থাকিস ভাই, অনেক ছবি তুলিস। 


ইতি
তোর পিয়া দি

বুধবার, ১ জুন, ২০১৬

যদিও ঠিক গল্প নয় ~ সৌম্যলেন্দু ঘোষ

প্রিয় মানিকদাদু,
অনেকদিন ধরেই ভাবছিলায তোমাকে একটা চিঠি দেব, কিন্তু বাবা কিছুতেই চিঠি লেখার জন্যে আমার স্কুলের বন্ধু রিকার মত সুন্দর গোলাপী কাগজ কিনে দিচ্ছিল না, তাই আর শেষমেষ না থাকতে পেরে স্কুলডায়েরী থেকে একটা পাতা ছিঁড়ে চিঠিটা লিখেই ফেললাম। হয়ত তুমি আমার চিঠিটা পড়ে অবাক হয়ে যাবে, ভাবতেই পারবে না যে তোমাকে এইরকম জায়গা থেকে আমার মত কেউ চিঠি পাঠাতে পারে। সত্যি বলছি, ছোট থেকেই আমার তেমন কোন বন্ধু নেই, সবাই যখন হৈ চৈ করে খেলা করে, তখন আমি চুপচাপ আমাদের ব্যালকনি থেকে হুইলচেয়ারে বসে দেখি, আর তোমার লেখা বইগুলো পড়ি; তবে মনে মনে পড়ি, কারণ এখন তো বাবা বই কিনেই দেয় না, তাই মাইন্ড রিডারই ভরসা। জানোতো, আমাদের ফ্ল্যাটটা খুউব উঁচু, প্রায় ১৩৫ তলা, আমরা ১১২তলায় থাকি। আমাদের ব্যালকনি থেকে কলকাতাকে খুব সুন্দর দেখায়। তোমাকে তো বলাই হয়নি ক্লাস থ্রি-তে পড়ার সময় একবার ফ্লো-ট্যাক্সিতে অ্যাক্সিডেন্ট করে আমি আর চলতে-ফিরতে পারিনা; ডাক্তারকাকু বলেছে আর একটু বড় হলে আমার শরীরে অ্যান্ড্রয়েডদের মত রোবোটিক লেগ ইনস্টল করে দেবে। স্কুলে রিকা আর রোজি মিস ছাড়া কেউ আমাকে ভালবাসে না; আমি তো এখন ক্লাস ফাইভে পড়ি, সেদিন ইন্ট্রিগ্যাল ক্যালকুলাসের একটা অঙ্ক পারিনি বলে পল স্যার কি বকাটাই না বকলেন! আচ্ছা, তুমিই বলোতো আমার মত ১১ বছর বয়সে কেউ রাতদিন পড়ে, তুমিই তো লিখতে এই বয়সটা হল খেয়ালখুশির বয়স, আমারো ইচ্ছা করে মুকুলের মত সোনার কেল্লায় যেতে, শঙ্কুদাদুর টিমের সাথে একশৃঙ্গ অভিযানে যেতে, কিন্তু বাবাকে এইসব বললেই বাবা আমাকে স্লিপিং ভেসেলে ঢুকিয়ে দেয়। আমাদের বাড়িতে একটা ছবি আছে জানো, আমি আদর করে ওর নাম দিয়েছি গণেশ মুৎসুদ্দির প্রোট্রেট; মায়ের একটা খুব সুন্দর পার্ল নেকলেস আছে, যেটাকে দেখলেই আমার রবার্টসনের রুবির কথা মনে পড়ে। আমারও ইচ্ছা করে স্পিরিট ক্যাচার অন করে বাতিকবাবুকে ডেকে নিই, আর উনি যেন সারারাত ধরে আমাকে ওনার অদ্ভুত কালেকশনের গল্প শোনান; আমারও ফটিকচাঁদ হতে ইচ্ছা করে, কিন্তু কিছুই হতে পারিনা। জানো আমারও একবার তোপসেদার মত ফেলুদার সঙ্গে গোয়েন্দাগিরি করতে ইচ্ছা করে, মনে হয় আমাদের ফ্ল্যাটের ছাদে উঠে একবার চেঁচিয়ে বলি 'জয় বাবা ফেলুনাথ', কিন্তু আমার ন্যান্সি আন্টি কিছুতেই আমাকে স্কুলের সময় ছাড়া ঘর থেকে বেরোতে দেয় না; ওহ! তোমাকে তো বলাই হয়নি ন্যান্সি আন্টি খুব আপগ্রেড একটা অ্যান্ড্রোয়েড, ওর চোখকে ফাঁকি দেওয়া খুব কঠিন। একেক সময় মনে হয় যখন ছোট ছিলাম, তখনই খুব ভাল ছিলাম, আমি আবার আমার ছোটবেলাকে ফিরে পেতে চাই। তোমাকেই একমাত্র বললাম আমায মনের কথা, পারলে আমাকে নিয়ে একটা গল্প লিখো....
ইতি- টুকাই ২২শে জুন, ২০৮৮
এরপর টুকাই স্পেস-টাইম কার্ভেচার মেশিনে গিয়ে চিঠিটা সত্যজিৎ রায়ের বাড়ির ঠিকানায় পোষ্ট করে দিল ঠিক ২২শে জুন, ১৯৮৮ তারিখে...

অবন্তী ~ অরুণজীব রায়

অবন্তী,
গতকাল তোমার প্রেরিত প্রেম প্রস্তাব পেয়েছি। এই প্রস্তাবের অপেক্ষায় কাটিয়েছি গত ৬টি বছর। নিজেকে তিল তিল করে গড়ে চলেছি তোমার যোগ্যতায়। হয়ত তোমার চোখে সে যোগ্যতা অর্জিত বলেই এই প্রস্তাব। কিন্তু আমি এখনো যোগ্যতা অর্জন করতে পারিনি। তাই অপেক্ষায় থাকুক আগামী।

অরুণজীব
৯ নভেম্বর ১৯৯৮
#

অবন্তী,
আজ আমি স্নাতক হলাম। 1st Class পেয়েছি। তোমার বাবার সম্মুখে যাবার প্রথম সিঁড়িটি পার হলাম। দুধের গাইটা বন্ধকে রেখে মা M.Sc. ভর্তির টাকা জোগাড় করেছেন। আগামী মাসের টিউশনের টাকা পেলে বন্ধকী গাইটা ছাড়িয়ে নেব।

অরুণজীব
১৫ এপ্রিল, ২০০০
#

অবন্তী,
তোমার গ্র্যাজুয়েশনের সাফল্যে অামি যারপরনাই অানন্দিত হয়েছি। বাবা তোমার সম্বন্ধ দেখছেন শুনে হতাশ হলাম। এখনো তিনটি বছর তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে। তাই তুমি এখন বিয়ে করবেনা জানিয়ে দাও এবং মাস্টার্সে এডমিশন নাও।

অরুণজীব
২ মার্চ, ২০০১
#

অবন্তী,
আজ আমার মাস্টার্সের রেজাল্ট প্রকাশিত হলো। প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছি। আগামী S.S.C. তে চাকরীটা পেতে হবেই। আমার রেজাল্টের ও আমাদের প্রতীক্ষার খবর তোমার (ও আমার) মা-বাবাকে জানিয়ে রেখো। তুমি আগামী বছর মাস্টার্স কমপ্লিট করবে আর আমি চাকরি পাব। তারপরই বিয়ে...

সোমবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

লুকোনো চিঠি ~ সৌমলেন্দু ঘোষ

বাবা,

 এই চিঠি তুমি যখন পড়বে তখন আমি আর এই পৃথিবীতে নেই। ভয় নেই, কাউকে দায়ী করে সুইসাইড নোট লিখতে বসিনি; বুকশেলফের এই বইটা হয়ত পুলিশ কখনো খুলেও দেখবে না, চোখে জল নিয়ে আদরের মেয়ের শখের বইগুলোর ধুলো ঝাড়তে গিয়ে হয়ত মায়ের হাত থেকে এই বইটা মাটিতে পড়বে, তখন তুমি এই চিঠিটা পাবে। তুমিই শিখিয়েছিলে সবসময় মাথা উঁচু করে বাঁচতে, সেই তুমিই সমাজের চাপে আমার জীবনটাকে পিষে দিলে? কি এমন দোষ করেছিলাম আমি? তুমি চেয়েছিলে আমি মেডিকেল নিয়ে পড়ি, তোমার দেমাকী কলিগ রোহিত আঙ্কেলের মেয়ে তৃণার মত মস্ত বড় ডাক্তার হই; আচ্ছা, ইচ্ছা করলেই কি সবাই সবকিছু হতে পারে? আসলে তোমার মধ্যে ছিল টেক্কা দেওয়ার অদম্য ইচ্ছা, বিলাসিতার হাতছানি, কোনদিনও জানতে চেয়েছ আমার মনের কথা? 
"শেষমেষ, ইংলিশ অনার্স, ছিঃ" বলে মুখটা ঘৃণায় বিকৃত করেছিলে যেদিন, আমার মনের কষ্ট কেউ দেখেনি। কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে আলাপ হল সুমন-দার সাথে, একঘেয়ে জীবন তখন উন্মাদনার কালবৈশাখী চাইছে। তারপর লুকিয়ে ঘোরা, পার্ক, সিনেমা; অফিসফেরতা তুমি দেখে ফেললে একদিন, তারপর বাড়িতে মায়ের বকুনি। সেই দিনটার কথা খুব মনে পড়ছে, কলেজ এক্সকার্শনের নাম করে সুমনদার সাথে গোপালপুর অন-সি, সেই দুইদিন মনে হয়েছিল জীবনে সবচেয়ে সুখের, ওর ষ্পর্শ সারা শরীরে নিয়ে ফিরে এসেছিলাম। কয়েকদিন পরেই মা তোমার কানে কানে কি বলল, আর তুমি এসে সপাটে মারলে এক চড়; 
"বেশ্যাগিরি চলবে না এখানে, এটা ভদ্রলোকের পাড়া, উফফ! কিভাবে যে লোককে মুখ দেখাব, অফিস থেকে ফিরে তোমার মুখ যেন আর না দেখি" এই ছিল তোমার আমাকে বলা শেষ কথা। সুমনদা বলল "হুর পাগলী, কাঁদছ কেন? অ্যাবরশান করিয়ে নাও, ফালতু ঝামেলা বয়ে কি হবে, আমার সব চেনাশোনা আছে"... 
পারলাম না শেষ পর্যন্ত; মাথা উঁচু করে যখন বাঁচতেই পারিনি, তখন আমার মরাই ভালো। হয়ত তোমার সোস্যাল স্ট্যাটাস বাঁচানোর জন্য টাকার জোরে গায়েব করবে আমার প্রেগনেন্সির রিপোর্ট, শুধু পরের দিন খবরের কাগজের এককোণে ছাপা হবে "তরুণীর রহস্যজনক মৃত্যু".

সম্পাদিকার ডেস্ক থেকে

উৎসবের আলোড়ন কিছুটা স্তিমিত , তবুও মনের অলিন্দে হৈমন্তী স্বপ্ন । বারো মাসের তেরো পার্বণ প্রায় শেষ মুখে , উৎসব তিথি এখন অন্তিম লগ্ন যাপনে ব...